সেই সব নানা রঙের দিনগুলি (পর্ব-১৯): নষ্ট মেধা, নষ্ট মানুষ ও লাঞ্ছিত মানবতা

শামসুল আরেফিন খান

কথায় বলে মুখের কথা ও বন্দুকের গুলি একবার বেরিয়ে পড়লে আর ফেরেনা। অবধারিত পরিণতি ও লক্ষ্যপানে ধাবমান থাকে। সেই যে একবার পাকিস্তানের জনক জিন্নাহ সাহেব অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রবল দর্পে বললেন,“ রাষ্ট্রভাষা হবে একমাত্র উর্দু। অন্য কোন ভাষা না। “। ৫৭ সালে সোহরাওয়ার্দী সাহেব বললেন, আমি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছি তাতেই পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ব শাসন ৯৮ভাগ অর্জিত হয়েছে। তার আগে ৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ফজলুল হক, কলকাতায় গিয়ে প্রাণের আবেগ ঝরিয়ে বললেন, ‘দুই বাংলার মাঝখানে এই যে রাজনৈতিক দেয়াল তোলা হয়েছে , আমি তা মানি না। মওলানা ভাসানি বললেন, ইনসাফ দাও নইলে রইলো “ আস্সালামু আলাইকুম”। সামরিক শাসন দিয়ে আইয়ুব খান বললেন, স্বায়ত্ব শাসনের মত অবান্তর কথা বললে’ ,“সির কুচাল দেঙ্গে- অর্থাৎ, মাথা কুচলে দেব “। তারই ধারাবাহিকতায় , আইয়ুবের উত্তরসূরি জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান বললেন,’ ৩০ লাখ বাঙালির মাথা কুচলে দাও , তা হলে বাকি সবার মাথা ঠিক হয়ে যা। ওরা দু মুঠো ভাতের জন্যে গিড় গিড় করবে’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবার সব কথার জবাবে বললেন, “রক্ত যখন দিয়েছি, আরও রক্ত দেবো, দেশকে স্বাধীন করে ছাড়বে ঈনশাল্লাহ”। সে সব কথা, সে সব উক্তি, পরিণতি সম্পন্ন না করে কখনও উৎসে ফিরে যায়নি। সে কথা কে না জানে?
তবে আমাদের দু একজন অতি অহঙ্কারি অধিক শিক্ষিত অতি জ্ঞানী, অতি বুদ্ধিমান বুদ্ধিজীবী, সুশীল বন্ধু আছেন , তারা এ’কথা জানেন কী জানেন না, তা ঠিক জানিনা। উচ্চ আদালতে মাননীয় বিচারকের সামনে তার এজলাশে প্রতিপক্ষে উচ্চাসনে বসা বিজ্ঞ মানুষটিকে ’জারজ ’বলতে তাদের একজনের রুচিতে বাধেনি, শালীনতায় বাধেনি, বিবেকে বাধেনি। । যোগাযোগ মাধ্যমের মুক্তাঙ্গনে মুক্ত আলোচনায় এসে তাদের আর এক কূলপুরুষ ,কর্তব্য পালনরত সাংবাদিক মহিলার দিকে আঙ্গুল তুলে তাকে“ চরিত্রহীন ”বলতে কুন্ঠিত হননি। তাদের সাথে সাংবাদিক জামাল খোশেগীকে জীবন্ত অবস্থায় করাত দিয়ে চুকরো টুকরো করে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিতে হুকুম দিলেন সৌদি যে যুবরাজ তার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। তাছাড়া ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্ট ট্রাজেডির রূপকারদের সাথেও এক সারিতে ফেলা যায়। অন্ততঃ আমার বিবেচনা তাই নির্দেশ করে। যাক সে কথা।
কথার কথা তো হ’ল এবার আসা যাক গুলির কথায়। সে অনেক পুরনো কথা। ৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯। ম্যানিলা সীমান্তে ভৌতিক শান্তি বিরাজ করছে। বন্ধুপ্রতিম মার্কিন বাহিনীর একজন টহলদার সৈন্যের বন্দুক থেকে গুলি ছিটকে মিত্রতুল্য একজন ফিলিপিনো মুক্তিযোদ্ধাকে ঘায়েল করলো। ফিলিপিনের সৈন্যরাও পাল্টা গুলি চালালো। ম্যানিলা দখলের দ্বিতীয় লড়াই এ’ভাবেই শুরু হয়েছিল। প্রথম লড়াই ছিল স্পেনের বিরুদ্ধে। এবারের যুদ্ধ মার্কিনীদের বিরুদ্ধে।
ফিলিপিনো বিপ্লবী বাহিনীর প্রধান নেতা ‘এগুইনালডো’ একজন উচ্চপদস্থ সেনা সদস্যকে দূত বানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বার্তা পাঠালেন মার্কিন সেনা কমান্ডারের কাছে । বার্তায় তিনি বলেছিলেন , আমাদের তরফ থেকে যে পাল্টা গুলি ছোড়া হয়েছে , তাতে আমার কোন অনুমোদন ছিল না। এটা আমার আদেশ ছাড়াই ঘটেছে । এটা দুর্ঘটনা বৈ কিছু না। উপনিবেশবাদী স্পেনের ৩০০ বছরের দখলদারিত্ব থেকে রাজধানী ম্যানিলা উদ্ধার করতে সে সময় ফিলিপিনের বিপ্লবী বাহিনী মার্কিন বাহিনীর সাথে যুগপৎ যুদ্ধ করে চূড়ান্ত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে অপেক্ষমান ছিল। গুলি বিনিময়ের আগে পর্যন্ত তারা ছিল মিত্র। মার্কিন কমান্ডার এলওয়েল ওটিস ‘শান্তি বার্তার’ উত্তরে বলেছিলেন, “যুদ্ধ যখন একবার শুরু হয়েছে তখন তো সেটা চলবেই , তার শেষ করুণ পরিণতিতে পৌঁছানো পর্যন্ত”। অথচ সে তার আগ পর্যন্ত প্রেক্ষাপট ছিল সাধারণ শত্রু স্পেনের বিরুদ্ধে দুই মিত্রশক্তির মিলিত সংগ্রামের। বাস্তব অবস্থায় ম্যানিলা তখন ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে নতজানু হয়ে পড়েছিল। ব্রিটিশ সৈন্যরা ম্যানিলা অবরোধ করে রেখেছিল। অপেক্ষাকৃত দুর্বল শক্তি নিয়ে ফিলিপিনো বিপ্লবী বাহিনী দ্বিতীয় বেষ্টনীতে অবস্থান করছিল। তার আগেই , আগস্ট ১৮৯৮, মার্কিন নৌবাহিনী ম্যানিলা অধিকার করেছিল এবং প্যারিস চুক্তি ১৮৯৮ এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেন -আমেরিকা যুদ্ধেরও অবসান ঘটেছিল। কাজেই ফিলিপিনো বিপ্লবী বাহিনীকে তখন আর প্রয়োজন ছিল না ব্রিটিশের। “কাজের সময় কাজী , কাজ ফুরালে পাজি”।
যে কোন প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ শক্তির অসম ঐক্যের স্বরূপ এভাবেই প্রকাশ পেয়েছে সারা ইতিহাস জুড়ে। এটা নতুন কিছু না। তাছাড়া চতুর ব্রিটিশ ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের উপর সাম্যবাদী বিপ্লবীদের একক ও নিরঙ্কুল দখল প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে , এ কথা ভাবাটাও ছিল ‘বোকার স্বর্গে বাস করার মত’ বাতুলত্ া।
৭৬৪১ দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে গঠিত পিলিপিন রাষ্ট্র কোনদিনই আর মার্কিন অধিকারমুক্ত হয়নি। ৩৩৩ বছর ফিলিপিন ছিল স্পেনের উপনিবেশ। গোপন সংগঠন “ক্যাটাপুনান” দীর্ঘদিন সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে মুখ থুবড়ে পড়লো। ১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষে উপনিবেশবাদী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে অসংগঠিত জনসংগ্রাম ব্যর্থ হয়েছিল। ব্রিটিশ হাতির পায়ে পিষে ফেলেছিল সেই মুক্তি সংগ্রাম্ । একইভাবে ফিলিপিনোদের সুসংগঠিত সুদীর্ঘ বিপ্লবী সংগ্রামও পদপিষ্ট হ’ল ।
(২): ১৯৮৬ সাল। বাংলাদেশে স্বৈরাচারী সামরিক শাসক হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে বিরোধী শক্তি একটা দুর্বল ঐক্য নিয়ে লড়াই করে একটা জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এসে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামি লীগ ৮ দল নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। একাত্তরে পর্যুদস্ত মৌলবাদী দল জামাতে ইসলাম বেগম জিয়ার গোপন সহায়তায় মূলধারায় উঠে এসেছিল। আওয়ামি লীগের পিছনে হেটে সেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে সেই অবস্থানকে পাকাপোক্ত করলো। স্বৈরশাসক জিয়া পঁচাত্তর পরবর্তী প্রেক্ষায় কবর থেকে তুলে এনে জামাতকে নতুন জীবন দিয়েছিল। তার ফেলে যাওয়া দল ও তার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গোপন শর্তে বনিবনা হ’ল না নব্য স্বৈরাচার এরশাদের সাথে। খালেদা ও তার লেজুড় সাতদলীয় ঐক্যজোট নির্বাচন বয়কট করলো। দুর্ভাগ্যক্রমে আমি সক্রিয় ছিলাম সেই জোটের কর্মী হিসেবে। সেই নির্বাচনে যাওয়া নিয়ে ১৫ দল ভেঙে শেখ হাসিনার ৮ দল ও বামদের ৫ দল হ’ল। আমি জেলে গেলাম ৩০ এপ্রিল রাতে। কথা ছিল সামরিক শাসন প্রত্যাহার না হলে কোনদলই নির্বাচনে যাবেনা। ১৫ দল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা বামদের নতুন ৫ দলীয় মোর্চাও নির্বাচনে গেলো না। তাদেরও অনেকে বন্দী হ’ল। বাংলাদেশের রাজনীতির সেই রাজকাহন পরিসরে অনেক বড় ও প্রণিধানযোগ্য। আজকের পরিসরে স্বার্থান্বেষী রাজনীতির সেই সাতকাহন সবিস্তার লেখা সম্ভব না। পরবর্তী কোন পর্বে সেকথা লেখার ইচ্ছা রইলো।
সেই উত্তাল দিনে খবর পেলাম ফিলিপাইনে ২১ বছরের স্বৈরাচার ফার্নেন্দিজ মার্কোসের পতন হয়েছে। স্বীকার করতে লজ্জা নেই , সে সময় পর্যন্ত ফিলিপাইনের ফিলহাল রাজনীতি সম্পর্কে বিশদ কোন ধারণাই আমার ছিলনা। জানাছিল কেবল , দীর্ঘ সময় জুড়ে, স্পেন ও মার্কিন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্যে সেই প্রাকৃতিক সম্পদে ঠাসা দ্বীপপুঞ্জের ভাগ্যহত জনগণের সশস্ত্র লড়াই সংগ্রামের কিছু কথা। কারণ একই সময় ভারতবর্ষের
মানুষ লড়ছিল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে। তবে সে লড়াই সন্ত্রাস করে শাসকশত্রু মেরেছে , কিন্তু কখনও গান্ধীবাদী শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহ , অসহযোগ আন্দোলনের পথ ছেড়ে পুরোপুরি সশস্ত্র রণাঙ্গনে গড়ায়নি। নেতাজী সুভাষের আজাদ হিন্দ ফৌজের দুর্বল মহড়া ও ক্ষণস্থায়ী কুচকাওয়াজ পর্যন্ত গিয়ে আর সামনে এগুতে পারেনি। কিছুটা আপোষকামী নেতেৃত্বের কারণে। কিছুটা বৈশ্বিক কারণে। তাই , সশস্ত্র যুদ্ধ করে ফিলিপাইনের লড়াকু জনগণ স্বাধীনতার পথে কতটা অগ্রসর হ’ল সেটা জানার প্রবল আগ্রহ নিয়ে অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রেখেছিলাম। ফিলিপাইনের বিপ্লবী যোদ্ধারা একাধিকবার স্বাধীন প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করে কেন বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেলোনা , সেটাও জানার বিষয় ছিল।
দখলদার মার্কিনীরা গণসংগ্রাম থামাতে না পেরে একসময় তাবেদার শক্তির হাতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে আড়ালে চলে গিয়েছিল। তথাকথিত অংশগ্রহনমূলক গণতন্ত্রের প্রহসন কায়েম ছিল। শোষণ জারি ছিল । অনাহার অনটন ছিল প্রায় ১০ কোটি মানুষের নিত্য সঙ্গী। সুবিধাভোগী উচ্চ শিক্ষিত সুশীল সমাজ খুঁজে মরছিল ক্ষমতায় যাওয়ার আরও সহজ সরল শর্টকাট পথ। কিন্তু অভাব তাড়িত দুঃখী মানুষ ডুব সাঁতার কাটা বিপ্লবীদের কলার ভেলায় চেপে উত্তাল সাগর পাড়ি দিতে ক্রমশঃ বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠায় বড় তরফের অনুমোদন নিয়েই স্বৈরশাসক ফর্ডিনান্ড ইমান্যূয়েল মার্কোস সিনিয়র ডিসেম্বর ১৯৬৫ ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন এবং ৭২ থেকে ১৯৮৬ সামরিক শাসনের বাতাবরণে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। তার চেয়ে বেশি দিন , ৩১ বছর , ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার স্বৈর শাসক সুহার্তো। তবে দুর্নীতির দৌড়ে তাকে হারিয়ে মার্কোস চ্যাম্পিয়ান হয়েছিলেন। সরকারের টাকা আত্মসাৎ, বিলাসবহুল ভোগবাদী জীবন যাপনে দেদার টাকা উাড়ানো ও নিষ্ঠুরতার জন্য বিখ্যাত ছিল তার শাসনকাল। মার্কোসের দাবি ছিল তিনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থেকে ফিলিপিনোদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মেডেল পেয়েছিলেন বীরত্বের জন্যে। কিন্তু মার্কিন সরকারের সামরিক দলিলে সে সবের কোন স্বীকৃতি ছিলনা। বরং তার অনেক দাবিকে ভাওতা ও অভিনব মিথ্যাচার বলা হয়। আইনের মেধাবী ছাত্র মার্কোস এটর্নী হিসেবে জীবন শুরু করেন। আইন পরীক্ষায় তিনি ৯৮ দশমিক ৮০ শতাংশ নম্বর পান। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের পুনর্মূল্যায়নে তা ৯২.০২ শতাংশে নেমে আসে।
মার্কোস ১৯৪৯ থেকে’৫৯ প্রতিনিধি পরিষদ এবং ১৯৫৯-৬৫ সিনেট সদস্য ছিলেন। ১৯৬৫ সালে কারচুপির নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। মুক্ত বিশ্বের বাজার অর্থনীতি অনুশীলন করে দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ মার্কোস সামরিক শাসন বলবৎ করেন। সামরিক শাসনামলে সংবিধান কাটাছেঁড়া করে রাজনৈতিক অভ্যুত্থান দমন, মুসলিম দলন ও কম্যুনিস্ট বিদ্রোহ পদদলিত করার জন্য যথেচ্ছভাবে আইন সংস্কার করেন । প্রচার মাধ্যমগুলোর মুখে তালা মেরে বাক্্স্বাধীনতা হরণের নতুন নতুন আইন প্রণয়ন করেন্ । গণতান্ত্রিক সততা দেখাতে সামরিক শাসন অনুমোদনের জন্যে ৭৩ সালেই গণভোট করেছিলেন। ৯০ দশমিক ৭৭% ভোটে তার সামরিক শাসনগণ অনুমোদন লাভ করে! তবে তার সেই গণভোট দারুণভাবে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়্ । আমাদের দেশেও অবৈধ শাসন অনুমোদনের জন্য অমন গণভোট অনুষ্ঠানের নজির রয়েছে যা ৯৮% গণ অনুমোদন পেয়েছিল ১৯৭৬ সালে। গণতন্ত্রের পক্ষে অমন একটি বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা সরকারকে জনগণ কী চোখে দেখছে সেটা পরখ করতে মার্কোস ১৯৮৬ সালে আবার একটা ভোট করলেন। কিন্তু সেবারে গণপ্রতারণা, কারচুপি ও রাজনৈতিক দমন পীড়ণ তার পতন ডেকে আনলো। ফেব্রুয়ারি ৮৬ গণঅভ্যত্থানে তিনি ক্ষমতা হারালেন। তার পক্ষে-বিপক্ষে সেনা সংঘাত ঘটার আশঙ্কা দেখে অলক্ষে বিধাতা প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান তাকে সিনেটার পল লাকজাল্টের মাধ্যমে তাকে ূূঈঁঃ ধহফ পঁঃ পষবধহূ মর্মে “চুপচাপ কেটে পড়ার অছিয়ত বার্তা পাঠান। মার্কোস পালিয়ে যান হাওয়াই দ্বীপে। তার স্থলাভিষিক্ত হন আততায়ীর গুলিতে নিহত জনপ্রিয় বিরোধী দলীয় নেতা সিনেটার বেনিগনো “নিনয়” একিনোর বিধবা পতœী কোরাজন কোরি একিনো।।
মার্কিন দলিলে প্রকাশ পায় ক্ষমতাচ্যুত মার্কোস পরিবারের ১০ বিলিয়ন ডলার পুকুর চুরির তথ্য। মার্কিন দলিলে তার পরিবারের অনৈতিক ও ব্যভিচারি জীবনযাপনের জন্য বহু বিলিয়ন ডলার পানির মত খরচ করার তথ্যও উঠে আসে। ইংরেজি টেরিফিক শব্দের অনুকরণে , তার অনাচারের প্রকাশ ঘটাতে নতুন তৈরি “ইমেলডেফিক” শব্দ ব্যবহার হতে থাকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। কোরাজন একিনো ফিলিপিনের নতুন প্রেসিডেন্ট হওয়ায় আমাদের রাজপথের স্লোগানের সাথে তার নাম যুক্ত হয়ে পড়ে। বিএনপি ছাত্রদলের তরুণরা বুঝে না বুঝে বাংলার কোরাজন খালেদা জিয়া স্লোগান দেয়া শুরু করে। মঞ্চের বক্তৃতায় এরশাদকে মার্কোসের পরিণতির কথা স্মরণ করালে জনতা স্লোগান তুলে -মার্কোস গেছে যে পথে এরশাদ যাবে সেই পথে। আওয়ামি লীগ শিবিরে মার্কোসের গণদলন ও দুর্নীতির রেকর্ড নিয়ে বক্তারা সোচ্চার হন। মার্কোসের ৯৮% রায় পাওয়া গণভোট ও কারচুপির নির্বাচনের সাথে জিয়ার গণভোট ও ৭৭-৭৯ ’র মিল দেখিয়ে দুজনকে একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ বলে হেনস্থা করা হয় । পরবর্তীকালে বেগম জিয়া বৈধব্য বেশ ছেড়ে রাজকীয় সাজসজ্জা নিলে তাকেও আওয়ামি ঘরাণা ইমেলদা মার্কোসের পাশে দাঁড় করাতে শুরু করে। ফিলিপাইনের সাবেক ফার্স্ট লেডি ইমেলদা মার্কোসের বাজেয়াপ্ত করা ২১ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের অলঙ্কারাদি নিলামে তোলে কোরাজন সরকার।
১৯৮৬ সালে তার স্বামী স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোস ক্ষমতাচ্যুত হলে তার পরবর্তী সরকার এসব অলঙ্কারাদি বাজেয়াপ্ত করে। একুশ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ফার্দিনান্দ পরিবার বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এই অভিযোগে ইমেলদার অলঙ্কারাদিসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছ থেকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। দুর্নীতির অভিযোগে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইমেলদাকে ১২ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। পরবর্তীতে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে ইমেলদা মুক্তি পান। ২০১৪ সালে ইমেলদার সংগ্রহে থাকা বেশকিছু চিত্রকর্মও জব্দ করে ফিলিপাইনের সরকার। চিত্রকর্মগুলো ‘সরকারি অর্থে’ কেনা হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। অবশ্য ইমেলদা তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই অস্বীকার করেছেন।
কেমন লোকজন দেশ শাসন করবে বা রাষ্ট্র পরিচালনা করবে তা নিয়ে তত্ত্ব চালাচালি হচ্ছে, বিতর্ক চলছে সেই প্লুটো টলস্টয় ও সক্রেটিসের যুগ থেকে। অনেক যুগে অনেক দার্শনিক বলেছেন মেধাবী লোকদের হাতেই রাষ্ট্র পরিচালনার ভার তুলে দেয়া উচিত। এখনও গণবিচ্ছিন্ন সুশীল সমাজ জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাদের জ্ঞান বুদ্ধি ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে থাকেন। কিন্তু রাষ্ট্র চালাতে শুধু তথাকথিত মেধা না, সেই সাথে নিখাদ দেশপ্রেম লাগে, জনগণের জন্য অকৃত্রিম ভালেবাসা লাগে, সততা ও নিষ্ঠা লাগে এবং নষ্ট মেধার নষ্ট মানুষ শুধু গণদুর্ভোগ বাড়ায় । তার বড় প্রমাণ রেখেছেন কুৎসিত মেধাবী মানুষ মার্কোস ও তার ভোগবাদী পত্নী ইমেলদা মার্কোস্।
ক্যালিফোর্নিয়া