সৌদি আরবে নামাজের সময় দোকান বন্ধ থাকছে না

একদিকে উদার ব্যবসা, অন্যদিকে সালমানের স্বৈরাচার

কাজী ইবনে শাকুর : সমগ্র সৌদি আরবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় দোকানপাট বন্ধ রাখা এত দিনের নিয়মিত চর্চা ছিল। কিন্তু এখন এই চর্চা বাতিল করা হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সৌদি রাজপরিবারের রাজপুত্র মহাক্ষমতাধর সালমানের ইঙ্গিতে এ বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমগ্র রাজতন্ত্রে এ নিয়ে বিতর্ক দিন দিন বাড়ছে। সাংবাদিক আদনান খাশোগিকে হত্যার বিষয়টি ধামাচাপা দেবার জন্য খুনের নির্দেশদাতা বলে খ্যাত একের পর এক নতুন নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করছেন। মহিলাদের দিচ্ছেন একা চলাফেরার সুবিধা-যা রক্ষণশীল কিন্তু সালমানের খুন-খারাবির বিরোধীরা অপছন্দ করে থাকেন। যেসব ব্যক্তি নামাজের সময়ে এবং ২৪ ঘণ্টা দোকানপাট খোলা রাখার পক্ষে তারা বলছেন, এতে সার্বক্ষণিক বাজার করার লোকদের সুবিধা হবে এবং তাতে বাণিজ্য বাড়বে। কিন্তু যেসব ব্যক্তি এই পদক্ষেপের বিরোধী, সেসব রক্ষণশীল মনে করছেন, এ পদক্ষেপ হবে সারা পৃথিবীর মুসলিম জাতির পরিচয়ের ওপর সর্বশেষ আঘাত।
যখন কোনো ক্রেতা রিয়াদের কোনো এইচএন্ডএম স্টোরে কোনো সর্বশেষ ফ্যাশন ব্রাউজ করতে ব্যস্ত, তখন লাউড স্পিকারে ভেসে আসে ‘তাড়াতাড়ি শপিং শেষ করুন।’ যদিও দোকান সর্বশেষ বন্ধ করতে আরো সাড়ে তিন ঘণ্টা বাকি। তার পরও নিয়মিত নামাজের জন্য ১০ মিনিট বিরতি দিতে দোকান বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু যারা নামাজ পড়েন না, তা তাদের জন্য বিরক্তিকর। যেহেতু দৈনিক ৫ বার নামাজের জন্য বিরতি দেওয়া হয়, এ ধরনের রেজিস্টার তাড়াতাড়ি বন্ধের জন্য ঘোষণা আসে কয়েকবার। এখন দীর্ঘমেয়াদি এই তৎপরতা, অর্থাৎ দোকান সার্বক্ষণিক খোলা রাখা নিয়ে বিতর্ক একটি নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমান এই রাজতন্ত্রের কার্যকরী শাসক বলা চলে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস রিপোর্ট করেছে- সালমান এই রাজতন্ত্রকে আরো ব্যবসাবান্ধব করতে চান। সামাজিকভাবে করতে চান উদারপন্থী, যদিও খাশোগিকে হত্যা করেছেন তার সমালোচনা করার জন্য। আর এই নামাজের সময় দোকান খোলা রাখার উদ্যোগ তার বিশেষ টার্গেট। রাজতন্ত্রকে ব্যবসাবান্ধব করার প্রয়াস।
ইতোমধ্যে এই রাজতন্ত্রে বিজনেস প্রতিষ্ঠান একটি কি দিয়ে ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়েছে। আর এর মধ্যে একটা সংশয় চালু হয়ে গেছে যে নামাজের জন্য কি দোকান আর বন্ধ করা হবে না? সৌদি আরবের স্টেট মালিকানাধীন আল আরাবিয়া নিউজ টেলিভিশন চ্যানেল টুইট করেছে, ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার সিদ্ধান্তের মধ্যে নামাজের সময়ও খোলা রাখার বিষয় জড়িত রয়েছে। কিন্তু অবশেষে এই টুইট মুছে ফেলা হয়। কারণ এক ডেপুটি মন্ত্রী বেতারে বলেন, এই ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার সিদ্ধান্তে নামাজের সময় খোলা বা বন্ধ রাখার বিষয়টা নিয়ে কোনো কথা হয়নি। যদিও ডেপুটি মন্ত্রী এই বিষয়টি অস্বীকার করেছেন, তবু দৈনিক সংবাদপত্র ‘ওকাজ’ এক অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে লিখেছে, এই নামাজের সময় ব্যবসা খোলা রাখার বিষয়টি সময়ের ব্যাপারমাত্র। খুব শিগগিরই খোলা রাখার অনুমতি মিলে যাবে।
সৌদিরা তাদের নামাজ বিভিন্ন সময়ে পড়ে থাকে। কিন্তু মুয়াজ্জিনের আজানের ধ্বনি নিয়মিত ভেসে আসে একই সময়, দৈনিক পাঁচবার। তা শুরু হয় সূর্যোদয়ের পূর্ব থেকে, যখন মাত্র কয়েকটি ব্যবসা খোলা রাখা হয়। তখন সকাল থেকে মধ্যাহ্ন পর্যন্ত ব্যবসার কোনো সমস্যা হয় না। জোহর পর্যন্ত কোনো নামাজ নেই। মধ্যাহ্ন থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কয়েকবার নামাজের বিরতি হয়, বিকেল ৩টা, ৬.৩০ ও ৮টায় আধঘণ্টার জন্য বিরতি হয়, যখন সৌদিবাসীর বাইরের টেম্পারেচার কমে এবং ট্রাফিক জ্যাম বাড়ে। যদি দোকানগুলো সার্বক্ষণিক খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে সৌদি আরবের ব্যবস্থা পার্শ্ববর্তী অধিকতর কসমোপলিটন ইউনাইটেড আরব আমিরাতের মতোই হবে। এই ব্যবস্থা বিক্রি বাড়াবে স্টোর মালিকদের লাভের জন্য। বলা হচ্ছে, প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য এই দোকান মালিকরা অবিরত লড়ছে, আর অধিকাংশ লোক অনলাইনে বাজার করছে।
আর যদি সার্বক্ষণিক দোকান খোলা রাখা হয়, তাহলে ভোক্তারা সার্বক্ষণিক সেবা পাবে। নগরের জীবনযাত্রার গুণাবলি উন্নত হবে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে এবং চাকরির সংস্থান বাড়বে। এ বক্তব্য বাণিজ্যমন্ত্রী মজিদ আল কাসাবির। কিন্তু রক্ষণশীল নাগরিকরা বলেন, এ পদক্ষেপ হবে মুসলমান জাতির পরিচিতির ওপর সর্বশেষ আঘাত।
নামাজ হচ্ছে ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের এক স্তম্ভ। আর এই নামাজ মুসলমান ও আল্লাহর সাথে প্রধান সংযোগ সাধনকারী। সৌদি মোল্লারা দীর্ঘদিন যুক্তি দেখিয়ে আসছেন, নামাজের সময় দোকান খোলা রাখা নিষিদ্ধ। তারা আরো সমালোচনা করেন যে নামাজের সময় দোকান খোলা রাখার কথা হচ্ছে, সমাজকে পশ্চিমা ধাঁচের করে গড়ে তোলা।
কিন্তু যখন রাজপুত্র সালমান সামাজিক উদারনীতির অ্যাজেন্ডা চালু করলেন, তখন মোল্লাদের প্রভাব খর্ব হতে লাগল। কিন্তু তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের সাথে বাড়তে লাগল স্বৈরাচারী শাসনের মাত্রা। টুইটারে আবদুল রহমান আল লাহিম নামের এক খ্যাতনামা আইনজ্ঞ লিখেছেন, ‘সৌদি আরবে এমন কোনো আইনগত খতিয়ান নেই, যার মাধ্যমে নামাজের সময় জোর করে দোকান খোলা রাখা হয়।’ এই দোকান বন্ধের বিষয়টা একসময় ধর্মীয় পুলিশের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়। ২০১৫ সালে রাজার এক আদেশে পুলিশের এ ক্ষমতা উঠিয়ে দেওয়া হয়।
তখন থেকে অধিকাংশ দোকান নামাজের সময় বন্ধ রাখার প্রথাটাকে সম্মান করে আসত। যদিও অনেকে দোকান বন্ধ করার পূর্বে কাস্টমারদের দোকান ত্যাগ করার জন্য বলাটা বন্ধ করে দিয়েছিল। এই দোকান বন্ধ রাখার বিষয়টা অনেক অ্যাক্টিভিস্ট ও কলামিস্ট বহুদিন থেকে অল্প অল্প বলে আসছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে তারা তা জোরেশোরে বলা শুরু করেছে।
রাজার নিয়োগকৃত সুরা কাউন্সিল, যা রাজাকে উপদেশ দেয়, তারা আধা সংসদ হিসেবে কাজ করে। তারা গত মাসে বলেছে, বিষয়টা তারা নিরীক্ষা করে দেখছে।
ইসা আল গায়েফ নামের এক সাবেক জজ পরামর্শ দিয়েছেন, প্রথমে প্রয়োজনীয় স্টোরসমূহ, যেমন ফার্মেসি ও গ্যাস স্টেশনগুলো নামাজের সময় খোলা রাখা যায়। সর্বশেষ নীতিতে স্বচ্ছতা না থাকায় অনেক বেপরোয়া বিজনেস, যেমন এক রিয়াদ কফি শপ ডিম লাইট জ্বালিয়ে পর্দা টেনে দিয়ে দোকান চালু রাখে নামাজের সময়।
কিন্তু তারা খরিদ্দারদের জন্য দরজা খোলা রাখে। এই প্রথায় যুবক সমর্থকদের একাংশ সাম্প্রতিক সময়ে বিকেলে যখন ল্যাপটপে কাজ করে, অন্য গ্রæপকে দেখা যায় প্রার্থনার জন্য মাদুর পাততে।