স্বদেশে প্রতারণার শিকার প্রবাসীরা

স্বদেশে প্রবাসীরা নানাভাবে প্রতারণার শিকার হয়ে আসছেন। প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক প্রবাসীই টাকা-কড়ি, জমিজমা খুইয়ে নিঃস্ব হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতারিত প্রবাসীরা কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। এ কারণে অনেকে হৃদয়ে তীব্র স্বদেশপ্রেম নিয়েও প্রবাসে মুখ বুজে পড়ে আছেন। ভয়ে-আতঙ্কে দেশমুখী হতে চান না। প্রবাসীদের সঙ্গে এই প্রতারণা কেবল পেশাদার দখলবাজ-লুটেরা কিংবা ক্ষমতাসীন দলের চিহ্নিত কিছু মাস্তান-ক্যাডাররাই করে না। অনেক সময় ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, কাছের মানুষজন দ্বারাও প্রতারিত হচ্ছেন প্রবাসীরা।
প্রবাসীরা যে সবক্ষেত্রে প্রতারিত হচ্ছেন, তার মধ্যে রয়েছে মূলত নগদ টাকা-পয়সা, জমিজমা, সহায়-সম্পদ এবং ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা সঞ্চয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব প্রতারক চক্রের পেছনে বখরার বিনিময়ে সহযোগিতা করে সংশ্লিষ্ট দফতর, ব্যাংকের কর্মকর্তারা। সে কারণে প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা প্রতিকারও পান না। উল্টো তারা প্রতিকার লাভের আশায় বিভিন্ন মহলে, দফতরে ঘুরে ঘুরে আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনেক সময় জীবনও হুমকির সম্মুখীন হয়। তখন প্রতিকার লাভের আশা ত্যাগ করে তাদের কেবল জীবনটা নিয়ে পালিয়ে আসতে হয়। অনেক সময় প্রতারিত প্রবাসীদের জীবন পর্যন্ত প্রতারকদের হাতে চলে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
ঠিকানায় এ রকম একটি প্রতারণার সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় অনেক প্রবাসী গভীর উদ্বেগের মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। অনেকে তাদের এই উদ্বেগ প্রকাশ করে মনটাও একটু হালকা করতে পারছেন না। ওই যে কথায় বলেÑবনে বাঘ আর জলে কুমির। অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসীদেরও সেই সংকট। আগে প্রকাশিত সংবাদটির কথা একটু বলে নেওয়া যাক। খবরটির শিরোনাম : ‘প্রবাসীদের অ্যাকাউন্ট থেকে লাখ লাখ টাকা উধাও/নেপথ্যে সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্র।’ প্রকাশিত হয়েছে ঠিকানার গত ২ নভেম্বর সংখ্যার ৩৮ পাতায়।
খবরটিতে বলা হয়েছে, লন্ডন প্রবাসী জনৈক জগলুল বাশারের সিলেটের দনিয়া শাখার ইসলামী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে একটি জালিয়াত চক্র জাল চেক, জাল স্বাক্ষরে ১৫ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে। ঘটনাটি গত ২২ ফেব্রুয়ারির, প্রকাশ পেয়েছে সম্প্রতি। জালিয়াতির নায়িকা শাহানা বেগম। তার নিজের স্বাক্ষর করা একটি জাল চেক দিয়ে ১৫ লাখ টাকা তার নিজের অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেন। পাঁচ দিন পর ১২ লাখ টাকা একই পদ্ধতিতে জগলুল বাশার চৌধুরীর অ্যাকাউন্ট থেকে শাহানা বেগমের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। একপর্যায়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের এই লেনদেন সম্পর্কে সন্দেহ হলে তারা জগলুল বাশারের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে যায়। পরীক্ষা করে দেখা যায়, চেক এবং সই সবই নকল। শাহানা বেগম দ্বিতীয় দফা প্রতারণা করতে গিয়েই ধরা পড়ে যান। এবং তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী দলের আরো কয়েকজন জালিয়াতও ধরা পড়ে।
এরপর তদন্ত করে দেখা যায়, ঘটনা একটি নয়। এ রকম ঘটনা আরো ঘটেছে। প্রবাসীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি সংঘবদ্ধ জালিয়াত চক্র কৌশলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই চক্রের সদস্যরা নিজেদের গ্রাহক পরিচয় দিয়ে শাখা ব্যবস্থাপকদের কাছে ফোন করে তাদের অ্যাকাউন্টে কত টাকা জমা আছে, জানতে চায়। তাকে এও বলা হয়ে থাকে যে, ফ্ল্যাট, প্লট বা অন্য কোনো প্রয়োজনে তার টাকা প্রয়োজন। যে কারণে সে একটি চেক জমা দিচ্ছে, সেটি যেন ক্লিয়ার করে দেওয়া হয়। এরপর বিশেষ প্রক্রিয়ায় চেক জাল করে, সই নকল করে জমা দেওয়া হয়। এ জন্য এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়। ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম থাকায় জালিয়াত চক্র সাধারণত চেক বইয়ের শেষ দিকের পাতা ব্যবহার করে থাকে।
একটি ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে জালিয়াতির এ রকম আরো ঘটনা বের হয়ে এসেছে। এতে উদ্ঘাটিত হয়েছে দেশের আরো অনেক জায়গায় ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনা। সন্দেহ করা হচ্ছে, এসব জালিয়াতির ঘটনার সঙ্গে ব্যাংকের কোনো কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারীর যোগসাজশও থাকতে পারে। অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, ব্যাংকের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ না থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, কোনো ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটিত হলেই যে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হবে, তেমনটা মনে করা যায় না। বাংলাদেশে ঘটনা তদন্তের বাহুল্য যেমন আছে, তেমনি আছে কোনো তদন্ত রিপোর্টের আলোর মুখ না দেখার সংস্কৃতি। তাই তদন্ত হলেই তার রিপোর্ট দেখার সুযোগ পাবে পাবলিক, কিংবা সেই দুর্ভোগ এবং দুর্গতি থেকে মানুষের মুক্তি মিলবে, এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই।
এখানে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে। প্রবাসীদের দুর্ভোগ-বঞ্চনা যে কোনো ব্যাংক জালিয়াতির মাধ্যমে তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে নেওয়ার মধ্যে সীমিত, তা নয়। দেশে ব্যাংক জালিয়াতির বাইরেও প্রবাসীরা নানাবিধ বঞ্চনা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। সহায়-সম্পদ খোয়াচ্ছেন দেশের দুর্বৃত্ত চক্র দ্বারা। অনেক সময় প্রতারণা, গুম খুনের শিকারও হচ্ছেন। প্রবাসীদের কল্যাণ করা, সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলে যারা প্রবাসীদের সমর্থন, সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে ক্ষমতায় গিয়েছে, তারা কথা রাখেনি। প্রবাসীরা এসব বঞ্চনা থেকে পরিত্রাণ পেতে চেয়েছেন। তারা সেই পথ খুঁজে পাননি। কেউ তাদের সেই পথ দেখাতে চায়নি।
প্রবাসীদের দাবিদাওয়া বা প্রত্যাশার মধ্যে কি এমন কিছু আছে, যা পূরণ করা অসম্ভব? প্রবাসীদের দাবিদাওয়া কী, তাদের প্রত্যাশাই-বা কী? আসলে প্রবাসীদের চাওয়া-পাওয়াটাও খুব বেশি বলে মনে হয় না। যতটুকু বুঝতে পারা যায়, কয়েকটি মাত্র দাবি। আর কিছু প্রত্যাশা। প্রবাসীরা যখন দেশ-মাটি-মানুষ ছেড়ে দেশের বাইরে থাকেন, তখন তাদের স্বদেশ-কাতরতা বহুগুণে বেড়ে যায়। তাদের মনের মধ্যে সব সময় স্বদেশ নিয়ে ভাবনা। স্বদেশের সুসংবাদে আনন্দ, আর দুর্ভোগ-দুর্বিপাকের খবরে বেদনা। এ রকম মন নিয়ে প্রবাসীরা সব সময় স্বদেশের স্মৃতিকে জড়িয়ে নিয়ে থাকতে চান। তারা প্রবাসেও স্বদেশের নামে সম্ভব সবকিছু করতে চান। পেতে চান স্বদেশের পতাকাবাহী বিমান। স্বদেশের নামে বাংলাদেশ ভবন, ব্যাংক চান। ভোট দেওয়ার সুযোগ চান। স্বদেশে প্রবাসীদের সুবিধার জন্য একটি মন্ত্রণালয় চান। স্বদেশে প্রবাসীরা এমন একটি পরিবেশ চান, যেখানে প্রবাসীরা দেশে গিয়ে নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারেন। আত্মীয়-স্বজন বা অন্য কেউ তাদের হয়রানি করতে পারবে না। প্রতারণা করতে সাহস পাবে না।
প্রবাসীদের দু-একটি দাবি পূরণ হলেও বেশির ভাগ দাবিই অধরা রয়ে গেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও প্রবাসীদের এসব দাবি কোনো গুরুত্বই পায় না। যারা দেশে রাজনীতি করেন, পালা করে ক্ষমতায় যান, তারা নির্বাচনসহ বিভিন্ন সময়ে প্রবাসীদের সমর্থন চান। বিভিন্নভাবে সহযোগিতা চান। প্রবাসীরাও নিজেদের রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শগতভাবে বিভিন্ন দলকে, রাজনীতিবিদদের সমর্থন দিয়ে থাকেন। সহযোগিতাও করেন সাধ্যমতো। কিন্তু বিনিময়ে প্রবাসীদের সামান্য যে প্রত্যাশা, তা পূরণ করার দিকে কেউ মনোযোগ দেন না। আশ্বাসের মুলো ঝুলিয়ে তারা ফিরে যান।
এই অবস্থা থেকে প্রবাসীরা বের হয়ে আসতে চান। স্বদেশের মানুষের কাছ থেকে তারা কোনো রকম বৈরী আচরণ প্রত্যাশা করেন না। তারা বিশ্বাস করেন, স্বদেশবাসীর কাছ থেকে এই আচরণ তাদের মনে ক্ষোভের জন্ম দেয়। এবং কে জানে, স্বদেশবাসীর এই হতাশাজনক আচরণ সইতে সইতে একদিন হয়তো তাদের সহ্যের বাঁধ ভেঙে যাবে। কে জানে, তখন তারা দেশবিমুখ হয়ে পড়বেন কি না!
সে রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাতে প্রবাসীরা হয়তো কষ্ট পাবেন, কিন্তু ক্ষতি হবে দেশেরই।