স্বাগতম হে প্রধানমন্ত্রী: দেশরত্ন শেখ হাসিনা

বিশেষ ক্রোড়পত্রের প্রচ্ছদ

মোহাম্মদ জামান খোকন

অন্যান্য বছরের মতো এবারও আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা জাতিসংঘের ৭৪তম সাধারণ অধিবেশনে যোগদান করবেন। আপনাকে স্বাগতম হে প্রধানমন্ত্রী। সেই ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। সেই গ্রামীণ পরিবেশেই বেড়ে ওঠা, গ্রামের স্কুলেই হাতেখড়ি। পরবর্তীতে মা-বাবার সাথে ঢাকায় আসা। ঢাকার আজিমপুর গালর্স হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাশ। পরবর্তীতে ইডেন কলেজে ভর্তি হওয়া। অবশ্য সেটা তখন ইন্টারমেডিয়েট গার্লস কলেজ নামে পরিচিত ছিলো। সেখানে ছাত্রী সংসদ নির্বাচনে সহ-সভাপতি হিসাবে জয়লাভ। বর্তমানে সেই কলেজ বদরুন্নেসা গার্লস কলেজ নামে পরিচিত। এভাবেই রাজনীতির হাতেখড়ি। বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের, যা বর্তমানে মাওলানা আজাদ কলেজ, নির্বাচিত জিএস। পিতার পথ অনুসরণ করেই ছাত্র রাজনীতিতে পদার্পণ। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা। ড. ওয়াজেদ মিঞার সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। দুই সন্তানের জননী। রাজনীতিতে কিছুদিনের জন্য বিরতি।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের চ‚ড়ান্ত বিজয়। পাকিস্তানের রাজনীতি ছিলো ষড়যন্ত্র ও হত্যার রাজনীতি। তারা বাঙালিদেও হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা এক সময় অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের যোগ্য উত্তরসূরী বঙ্গতাজ তাজউদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ। সর্বোপরি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরা গান্ধী সরকারের সহযোগিতা ও আমাদের মুক্তিযোদ্ধা ভাইবোন ও ৩০ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ লাভ করি। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেই রাতেই তাকে বন্দি করে পাকিস্তান নিয়ে যায় সেই জল্লাদবাহিনী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং বঙ্গতাজ তাজউদ্দিনের নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। এখানে একটা কথা না বললেই নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারেন নি। তিনি স্বাধীনতার বার্তা চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের কাছে পাঠিয়ে দেন। তারা চট্টগ্রাম বেতার কর্মীদের সহায়তায় তা প্রচার করেন। পরবর্তীতে ২৭ মার্চ তৎকালীন মেজর জিয়া ও তা পাঠ করেন। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের জন্ম হয়। আমাদের নেতা তখনও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। অবশেষে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বৃটেন ও ভারত হয়ে নিজের দেশে ফিরে আসেন।

তারপর রাজনীতির দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন। ১৯৭৩ সালে আবার নির্বাচন হয়, সেটা ছিলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন। কিন্তু এদিকে পরাজিত শত্রু তা বসে নেই, তারাও ষড়যন্ত্র শুরু করে। একসময় সেই বিশ্বাসঘাতক মোশতাকের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর লোকেরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ পরিবারের লোকজন ও আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করে। সৌভাগ্যক্রমে দু’বোন- শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ড. ওয়াদের সাথে জার্মানিতে ছিলেন বিধায় প্রাণে বেঁচে যান।
শুরু হয় শেখ হাসিনা ও রেহানার দুঃখের জীবন। এক সময় রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর সহায়তায় ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগে সংকট দেখা দেয়। অবশেষে ১৯৮০ সালের ১৭ মে বাংলাদেশে ফেরত আসেন। সেদিন তিনি নিজের বাবার বাড়িতে উঠতে পারেননি। বাবার আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করেন। সেই থেকে পথচলা। তখন ছিলেন সামরিক শাসক মরহুম জিয়াউর রহমান। একসময় জিয়াউর রহমান মৃত্যুবরণ করেন। আরেক সামরিক শাসক এরশাদ ক্ষমতা নেন। তিনি প্রায় ১০ বছর দেশ চালান। তারই অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন ১৯৮৬ সালে। প্রথম বিরোধী দলীয় নেতার পদ গ্রহণ করেন। একসময় এরশাদেরও পতন হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি ক্ষমতায় যায়। একসময় মাগুড়ার নির্বাচনে কারচুপির জন্য তাদেরও পদত্যাগ করতে হয়। সংবিধানে তত্ত্বাধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে, তা পাশ করানো হয়।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে ক্ষমতাগ্রহণ করে। দেশরত্ন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ ২১ বছর পর মানুষ স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরে পায়। জয় বাংলা স্লোগান দেয়া আবার শুরু হয়। যে ৭ই মার্চের বক্তৃতা বর্তমানে সারাবিশ্বে পরিচিত, তাও আবার মানুষ শুনতে পায়। জিয়াউর রহমান যে কুখ্যাত বিল জারি করে সংবাদে পাশ করিয়ে ছিলেন, তাও বাতিল হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু হয়। তার রায়ও হয় কিন্তু কার্যকর হয়নি। পরবর্তীতে আবার জিয়াউর রহমানের দল ক্ষমতায় আসে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় স্থগিত হয়ে যায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে, যদিও বলা হয়ে থাকে সেনা সমর্থিত সরকার, আবারও আওয়ামী লীগ বৃহত্তর জোট করে ক্ষমতায় যায়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের হত্যার রায় কার্যকর করা হয়। আস্তে আস্তে উন্নয়নের দিকে দেশ এগিয়ে যেতে থাকে। এখানে একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, দেশে ফিরেই দেশরত্ন শেখ হাসিনা মিটিংয়ে জোর দিয়ে বলতেন- ৭৫-এর পরে সব অবৈধ সরকার। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতও তা রায় দিয়েছে।

২০০৮ সালে সরকার গঠনের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবেন বলে অঙ্গীকার করেন, তাও বাস্তবায়ন করেন। এখনও বিচার চলছে। বাবার আমলে ভারতের সাথে যে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি হয়েছিলো, তাও বাস্তবায়িত হয়েছে। ঢাকার যানজট যদিও আছে কিন্তু ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। অর্থাৎ প্রথম দু টার্মে তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে জোর দেন। তারপরে আসে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, সেটাও মোকাবেলা করেন। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়েছে বলে তাদের সহায়তা বন্ধ করে দেন। দেশরত্ন শেখ হাসিনা জোর দিয়ে বলেন- ‘আমরা নিজেদের অর্থ দিয়ে সেই সেতু তৈরি করবো।’ যা আজ বাস্তবায়িত হচ্ছে। ঢাকায় যানজট কমানোর জন্য পাতাল ট্রেনের কাজ চলছে। সেটাও ইনশাল্লাহ আগামী ২ বছরের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে। পদ্মা সেতুর কথা আমাদেরকে ৭ মার্চের সেই কথাটি মনে করিয়ে দেয়। বঙ্গবন্ধু এক পর্যায়ে বলেছিলেন- ‘তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। রক্ত যখন দিয়েছি, আরও রক্ত দেবো। এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ হ্যাঁ ঠিকই যোগ্য পিতার যোগ্য কন্যা। তাই করছেন। পৃথিবীর অন্যান্য সরকারকে দেখিয়ে দিয়েছেন- আমাদেরও শক্তি আছে। আমরা অমাদের সম্পদ দিয়ে নিজেরাই দাঁড়াবো।
তারপরে আসে সংবিধানের কথা। একটি দেশের চালিকা শক্তি হলো সংবিধান। কিন্তু ২টি সামরিক সরকার তা রক্ষা করেনি। সংবিধানকে কাঁটাছেঁড়া করে তারা অনেক পরিবর্তন করেছে। কিন্তু দেশরত্ন শেখ হাসিনা পর পর দু’টি নির্বাচনই সংবিধান মোতাবেক নির্ধারিত সময় মতো করেছেন। রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন- তা আর নাইবা বললাম। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নতি হয়েছে। সারা বাংলাদেশই এভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশ নদীমাতৃক দেশ। দু দুবার ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। সেটাও তিনি ও তার সরকার সামাল দিয়েছেন। যথাসময়ে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। বর্তমানে যেটা আমাদের জন্য বোঝা, রোহিঙ্গা শরণার্থী। তাও আশা করি দেশরত্ন শেখ হাসিনার কূটনৈতিক তৎপরতায় সুষ্ঠু সমাধান হবে।
এতো সাফল্যের পরেও যে জিনিসটা এখনও আমাদের দেশে কার্যকর করা হয়নি, সেটা হলো- আইনের শাসন ও বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা। প্রতিদিন খবরের কাগজ উল্টালেই দেখি নারী নির্যাতন, হত্যা ইত্যাদির খবর। পুলিশের বিরুদ্ধে যেমন অভিযোগ আছে, তেমনি পুলিশ কখনও কখনও তৎপর। আসামী ধরে কিন্তু বিচার দীর্ঘদিন চলতে থাকে। রায় কার্যকর হয় বিলম্ব। শুধু ২টি হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করছি। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনু ও সাবেক পুলিশ অফিসার বাবুল আক্তারের স্ত্রী তনু হত্যা। বেশ কয়েক বছর হলো এখনও তার বিচার শুরু হয়নি।
হে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণকে আপনি ভালোবাসেন। তারাও আপনাকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ভালোবাসে। আপনি অনেক পরিশ্রম করছেন, শুধু আরজ- বিচার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজান। দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকরের ব্যবস্থা করুন। ছাত্র নামধারী চাঁদাবাজদের শাস্তি দিন। ২১ আগস্ট হত্যা মামলার বিচার দ্রুত শেষ করুন। এখন সবাই আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগ হয়ে গেছে। প্রকৃত লোকদের রক্ষা করার ব্যাবস্থা করুন। ভ‚য়া ও ছদ্মবেশীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। সময় চলে যাচ্ছে, সারা দেশের মানুষ আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। জাতিসংঘে আপনার সফর ফলপ্রসূ হোক এ কামনা করি। আজকে যারা বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য জীবন দিয়েছেন, সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি। আপনি সুস্থ থাকুন। হে সৃষ্টিকর্তা, তুমি আমাদেরকে তোমার রাসূলের পথে চলার শক্তি দাও। তুমিই মহান। আমিন।
-পোকিপসি, নিউইয়র্ক।