স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর আমাদের ন্যায্য প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

অধ্যাপক মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম

কিছুদিন আগে অনলাইনে যুগান্তর পত্রিকার পাতা উল্টাতেই দুটি নিউজ হেডলাইনে চোখ আটকে গিয়েছিল। যদিও বিষয়গুলো বাংলাদেশের রাজনীতির অপসংস্কৃতির নিত্যনৈতিক ঘটনারই ধারাবাহিকতা মাত্র।

১. বিএনপি দেশে ও বিদেশে বসে বড় বড় মাফিয়াদের সাথে বৈঠক করে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র করছে।
বয়ানে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জনাব এনামুল হক শামীম।

২. পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের সাথে বিএনপির দহরম-মহররম বহু পুরোনো।
বয়ানে অতিকথন মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সাহেবের যোগ্যতম উত্তরসূরি আমার বিভাগীয় চবিয়ান অগ্রজ জনাব হাসান মাহমুদ সাহেব, স্বাধীন সংবাদপত্র পাঠক সমিতি, বাংলাদেশ-এর এক অনুষ্ঠানে বলেছেন।
স্বাধীন সংবাদপত্র পাঠক সমিতি, বাংলাদেশ। জানি না সংবাদপত্র স্বাধীন, নাকি পাঠক স্বাধীন?
(সংবাদপত্র ততটুকুন স্বাধীন সরকার যতটুকু সহে, পাঠক ততটুকুন স্বাধীন, শুধু পড়ে যাও, দেখে যাও ও শুনে যাও কিন্তু কিছু বলা যাবে না।)

এটা দেখে মনে পড়ে গেল, চবি ক্যাম্পাসের স্যার এফ রহমান হলের পার্শ্ববর্তী নুরুর দোকানের একটা সাইনবোর্ডের লেখা : ‘এখানে খাঁটি গরুর দুধ পাওয়া যায়।’
দুধও খাঁটি হতে পারে আবার গরুও খাঁটি হতে পারে।
বুঝের লোকের বোঝার জন্য অনেক রসদ বিদ্যমান!
জাফোইন বা খাঁচি (গ্রামীণ অঞ্চলে খড়-কুড়ো, ঘাস, লতা-পাতা নেওয়ার বহু বড় বড় ছিদ্রযুক্ত পাত্রবিশেষ) চালুনিকে বলে তোর পাছায় অনেক ছিদ্র?

রাজনৈতিক বিতর্কে কেউ পাকিস্তানপন্থী, কেউবা ভারতপন্থী। আওয়ামী লীগ বিএনপিকে পাকিস্তানপন্থী বলে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার চেষ্টা করে। মজার বিষয় হচ্ছে, বিএনপির সাথে যদি পাকিস্তানের সাথে দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো সম্পর্ক থেকেই থাকে, তা গোপনীয়, সত্য-মিথ্যা তারাই জানে, জনগণের জানার সুযোগ নেই।

১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তান বাংলাদেশকে শোষণ করার তেমন কোনো সুযোগ আর নেই, অন্তত ভৌগোলিক কারণে।

অথচ ৭১ সালে ভারত বাংলাদেশকে বন্ধুত্ব নামক মুলার আড়ালে শত্রুরাষ্ট্র পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করে শত্রুকে দুর্বল করা ও বাংলাদেশকে শোষণ করা তথা সীমান্তে নিরীহ মানুষ হত্যা, ফারাক্কা, তিস্তাসহ সকল অভিন্ন নদীর ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা, মাদকসহ প্রচলিত ও অপ্রচলিত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চোরাচালান, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শোষণ, রোহিঙ্গা ও ভারতীয় মুসলমানদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে পুশব্যাক করাসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে কোনো সময়েই বাংলাদেশের পক্ষে ছিল না। যদিও আমরা (বর্তমান শাসকগোষ্ঠী) একতরফাভাবে বলেই যাচ্ছি, ভারত আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু। বন্ধুত্ব কি কখনো একতরফা হতে পারে? রাষ্ট্রীয় বন্ধুত্ব হতে হয় দ্বিপক্ষীয় Give and take policy, কিন্তু ভারত আমাদের শাসক দলের দলীয় ক্ষমতার মোহকে কাজে লাগিয়ে নতজানু পররাষ্ট্রনীতির সুযোগে প্রতিনিয়ত আমাদের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে, যা অদ্যাবধি শোষণ করে যাচ্ছে।

কী নানার বাড়ির আবদার! আমাদের রাস্তাঘাট, ব্রিজ, নৌপথ-রেলপথ ব্যবহার করে তাদের মালামাল পরিবহন করবে কিন্তু কোনো ফি দেবে, তাহলে তাদের ব্যবহারের ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত রাস্তা-ব্রিজ কে মেরামত করবে?
বরাবরের মতো আমরা আশা করব, মোদির এই সফর আমাদের জন্য ফলদায়ক হবে। ভারতীয় কোনো অফিশিয়াল না বললেও আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তিস্তা চুক্তি লিখিত হয়ে আছে, শুধু ঘোষণা বাকি। আমরা সেই বক্তব্যে বিশ্বাস রাখতে চাই।
প্রতিবেশী বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকে আমরা বন্ধু হিসেবে সব সময় সম্মান ও ভালোবাসতে চাই, মোড়ল বা দাদাগিরির ভূমিকায় নয়। যদিও অতীত ইতিহাস সুখকর নয়, আমরা দিল্লি গিয়েছি দিয়ে এসেছি, দাদাবাবুরা খালি হাতে বেড়াতে এসেছেন যাওয়ার সময় কিছু না কিছু নিয়ে গেছেন!

তাই আমাদের প্রধানমন্ত্রী একবার অভিমান করে বলেছিলেন, ভারতকে আমরা যা দিয়েছি তা ভারতকে আজীবন স্মরণ করতে হবে। যদিও আমরা জনগণ এখনো অন্ধকারে, কিছুই জানি না!

আমার এক জেঠাতো ভাই কৌতুকচ্চলে বলেন, আসমু-জামু-খামু, আসবেন-যাবেন-খাওয়াবেন। আপাতদৃষ্টিতে শুনতে মনে হয় আসা-যাওয়া-খাওয়া দ্বিপক্ষীয়, কিন্তু যার মর্মার্থ হলো শুধু একপক্ষীয়, গেলেও খাওয়াবেন, এলেও খাওয়াবেন। ভারত এমন স্বার্থপর বন্ধু সেই তত্ত্বেই বিশ্বাসী। তাহলে এ ধরনের স্বার্থপর রাষ্ট্র আবার বন্ধু হয় কীভাবে?
সাংবাদিক জনাব নুরুল কবির তার এক টক শোতে যথার্থই বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র নয়, এটা বুঝতে পারাটাও একটা বড় অর্জন।

সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলের ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’ বইয়ের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রকৃত অবস্থা, ভারতে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শিবির, ১৬ই ডিসেম্বর ও ভারতীয় সৈন্যের অনুপ্রবেশ, বাংলাদেশে ভারতীয় বাহিনীর পরিকল্পিত লুণ্ঠন-সংক্রান্ত বিষয়গুলো পড়লে কোনো দেশপ্রেমিক বাংলাদেশি ভারতকে বাংলাদেশের বন্ধু বলার কোনো অবকাশ আছে বলে মনে করি না বা আজ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি মেজর জলিলের লেখার সত্যতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করেছেন বলেও শুনিনি।
বর্তমান সরকারের সাথে ভারতের কেমন সম্পর্ক বা শাসক দল কেমন ভারতপন্থী (সরকারের মন্ত্রীর ভাষায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, রক্তের সম্পর্ক ইত্যাদি), তা জনগণকে স্মরণ করে দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো মিডিয়াতে আলোচনায় সরকারদলীয় লোকজন ভারতীয় প্রসঙ্গ এলে এমনভাবে ভারতের পক্ষাবলম্বন করে আনুগত্যের প্রমাণ দেন, যেখানে একজন ভারতীয়ও শুনলে লজ্জা পাবেন।
সরকারি দলের সাথে ভারতের এমন প্রকাশ্য সম্পর্ক থাকার পরও বিএনপিকে পাকিস্তানপন্থী বলে অঙ্গুলিনির্দেশ করা কতটুকু শোভন? যদিও বিএনপি ও অন্য কোনো রাজনৈতিক দল অন্য কোনো দেশের পক্ষে ওইভাবে বলে কি না আমার জানা নেই।
আমরা সবাই বাংলাদেশি হিসেবে দোষারোপের রাজনীতি বাদ দিয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সকল রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে একসুরে আওয়াজ না তুললে প্রতিপক্ষ সব সময় আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নেবে। আশা করি, স্বাধীনতার ৫০ বছর উদ্্যাপন উপলক্ষে সবার সেই বোধোদয় জাগ্রত হবে।

-ব্রুকলিন, নিউইয়র্ক