স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

ফেরদৌস সাজেদীন

অর্জনের ললাটে তিলক পরাতে সব জাতিই উৎসুক থাকে। অর্জনের বর্ণচ্ছটা যদি ইতিহাসের দিকে অগ্রসরমান হয়ে ‘কাল’ রচনা করে, তাহলে ‘জয়ন্তী’ অর্জনের শিরে প্রতিষ্ঠিত হয়। সে পথেই বাংলাদেশের ভৌগোলিক স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এ বছর। সব মানুষই স্বাধীনতা চায়, এই চাওয়া একান্তভাবেই তার সহজাত। স্বাধীনতা : এক. মনের ও ভাবের, বোধের ও তার ব্যাপ্তির; দুই. রাষ্ট্রিক। মানুষের এই চিরন্তন ও অনায়াস চাওয়া মৌলিক ও পরম হলেও তার প্রাপ্তি হয় আপেক্ষিক। চাওয়া-পাওয়া অভিন্ন তো হয়-ই না, বরং মানুষের চেতন মন যা চায়, তা রাষ্ট্র দিতে অপারগ হয়। আবার রাষ্ট্রের অবস্থিতিও হয় কখনো কখনো অধরা। জাতি আছে, রাষ্ট্র নেই-এ রকম অনেক জাতিই পৃথিবীতে আছে। আবার রাষ্ট্র আছে অথচ তার মানুষের মৌলিক চাহিদার সংস্থান নেই, মন ও মননের অগ্রসরতার পথ নেই, থাকলেও তা সীমাবদ্ধ, এমন অনেক আছে। মোটকথা, এসব বিশ্লেষণে শেষ পর্যন্ত আশার অনেক অন্তরায় ঘটে-গোটা মানবসমাজ তার প্রাপ্তির চাইতে অপ্রাপ্তির সংস্থাপন দেখে আসছে বেশি।

দেখে এলেও এই আপেক্ষিকতার বিরোধ ও সংঘর্ষটা তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এবং সময় সময় স্থান-কাল-পাত্রে তা সে ব্যক্ত করে। সংঘর্ষ বলেই যেমন জয় আছে, তেমনি পরাজয় আছে। জয় না যত বেশি, পরাজয় তত বেশি। পৃথিবী মানুষের, আবার অনেক মানুষ তার নিজ জাতির একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার সুযোগ পায় না, আর চৈতন্যের বিপন্নতার কথা তো আসেই না। কোনো কোনো জাতির মন ও মননের অন্তঃশীল শোরগোল জীবদ্দশায় মরে যায়, আর কোনো কোনো জাতি বৈরিতার মুখোমুখি হয়ে জীবনভর আক্রোশ-অন্তরে বিপর্যস্ত হয়ে থাকে। জাগরণ হয় না। ‘জয়ন্তী’ শিথিল হয়ে দূরে থাকে।

সে বিচারে আমরা, বাংলাদেশিরা কতই না সুপ্রসন্ন ভাগ্য নিয়ে জন্মেছি। আমাদের দেশ আছে, জাতীয়তা আছে। সর্বোপরি আমাদের ভাষা আছে, ভাষার সুষমা আছে। আর সেই ভাষার প্রাণে ও টানে আমরা উচ্চারণ করি জীবনের সকল উদ্‌যাপন। ভাষার প্রবহমানতার স্পন্দনে আমরা জেগে থাকি, জেগে থেকে জাগরণের গান গাই। জাগরণের এই স্পৃহা, এই আগ্রহ ও উন্মাদনাই বাংলাদেশির স্বদেশচেতনার উপযোগ। আর সে কারণেই তার দেশ আর জাতীয়তার শিরে আজ জ্বলজ্বল করে উঠেছে ‘সুবর্ণজয়ন্তী’। স্বাধীনতার ৫০ বছর। একটি রাষ্ট্রের ৫০ বছর বয়স কি পর্যাপ্ত বছর, কিছু ভালো বলার বা মন্দ বলার? এসব পর্যালোচনা করার পরিসর এখানে নেই, শুধু বলি, পঞ্চাশে এসে বাংলাদেশ তার জীবনের সকল প্রবর্তনাতেই জেগে আছে।

যেমন জেগে উঠেছিল ২৬ মার্চের রক্তের বন্যা দেখে। ইতিহাস সবার জানা। ১৯৭১ এর ১ মার্চ থেকে অপেক্ষা। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও সরকার গঠন করতে পারছে না বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ; তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান মার্চের ৩ তারিখের অ্যাসেম্বলি ভেঙে দিয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ফুঁসে উঠেছে, চরম ষড়যন্ত্রের দাপাদাপি, গর্জে উঠল জনতা। মার্চের একেকটি দিন হয়ে উঠল একেকটি জাগরণের দিন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে মার্চের ২ তারিখে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা তুলল।

আমি স্পষ্ট মনে করতে পারি, ২৬ তারিখের আগের দিনগুলোতে মার্চের ঢাকার বাতাসে যেমন ঢেউ এসেছে অস্থিরতার, সন্দেহের আর আশঙ্কার, পাশাপাশি শিশিরের মতো ঝরেছে আশা, উত্তাপের মতো, মুক্তির মতো এক নেশাঘন আকুতি, এক নতুন পৃথিবীর, নতুন জীবনের সম্ভ্রমের জন্য। কারফিউ আর হরতালের মধ্যেই এক কাক্সিক্ষত দেশেই জনগণের জীবনযাত্রা উপনীত হবে-এই বিশ্বাস গভীর হলো। মার্চের ৩ তারিখে সারা ঢাকার সড়কে সড়কে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জোয়ার-প্লাবিত মিছিলের পর মিছিল, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ছড়িয়ে দেয় সংগ্রামের কর্মসূচি, বঙ্গবন্ধু ডাক দেন অসহযোগ আন্দোলনের। বললেন, ট্যাক্স না দিতে পাকিস্তান সরকারকে, হরতাল চলবে প্রতিদিন, আর তিনি বললেন, ৭ তারিখে রেসকোর্সে জনসভায় যেতে, তিনি পরবর্তী পদক্ষেপের ঘোষণা দেবেন। সকল স্কুল, কলেজ, পরিবহন, কোর্ট বন্ধ থাকল। ইতিহাস সবার জানা।

মার্চের ৭ তারিখে ঢাকার রমনার রেসকোর্সে জনসমুদ্র, উত্তাল জনতা ডাক শুনবে নেতার। বঙ্গবন্ধু অনিবার্য ডাক দিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তারপর মার্চের বাকি দিনগুলোয় একটা বিচ্ছিন্নতার বাতাস বইল, যে বিচ্ছিন্নতার ডাকে দেশপ্রেমের সংগীত আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করল; ঢাকার আলো, ঢাকার ধুলো, কোলাহল, সব সব এই অস্থিরতার ভেতরেও আপন আপন এক উত্তেজিত স্বস্তি দিল; অচিন, আবার চেনা, নতুন এক শিহরন গা-বেয়ে উঠছে, অনুভব করল জনগণ। সারা পূর্ব পাকিস্তানের শহরে, বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে বার্তা পৌঁছে গেল বঙ্গবন্ধুর। তারপর সেই ঘটনা, কালরাত্রির নৃশংসতা, মানব ইতিহাসের কলঙ্কের কথা বলি, সে শক্তি আমার কোথায়! আমিও জেগে থাকার জাতির সন্তান, আমিও বাংলাদেশির অভিমান ও সম্ভ্রমের স্বরে ও সুরে জীবনযোগী, তবুও আমি সাহস হারাই-পৃথিবীর মানুষ শুনল ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের কথা, রাতের বেলায় অতর্কিত হামলা করে ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে পাকসেনার দল, শুনল, কিন্তু তখনো বিন্দুমাত্র উপলব্ধি করতে পারেনি বীভৎসতার চিত্রটি। এর আগেও নানা দেশে গণহত্যা হয়েছে, পৃথিবীর মানুষ তা জেনেছে, কিন্তু বাংলাদেশি সেই রাত্রে, বাংলাদেশি হবার গৌরবের বেদিতে পা রাখার মুহূর্তে রক্তের বন্যায় ভেসে গেল, পৃথিবীর মানুষ তখনই তা বুঝতে পারল না; কিন্তু জেগে থাকাই যে জাতির স্বভাব, সে মুক্তির পথে বিদ্রোহী হয়ে উঠল।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। তার পরের ইতিহাস বাংলাদেশির বিষাদের আর গৌরবের ইতিহাস। বাংলাদেশি স্বাধীনতাসংগ্রামে দেহ-প্রাণ সঁপে দিল। নয় মাসের সেই অবরুদ্ধ দিনগুলো এত বছর পরেও স্পষ্ট মনে পড়ে। সেসব বারান্তরে বলার ইচ্ছা রইল।

বাংলাদেশি আজ পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। স্বদেশে যেমন অন্য দেশেও বাংলাদেশি জেগে থাকে। দেশান্তরি হওয়ার সময় এই জেগে থাকার কৌশলটিও সে বহন করে। তার এই জাগরণের কোনো বিনাশ নেই, নেই ভৌগোলিক কোনো সীমানা। বাংলাদেশের কোমল মানুষ, জীবনের ঠাঁই নির্মাণে পরিশ্রমী হয়। এই আমাদের শহরেই দেখি, নিত্যদিন তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশির গৌরবগাথা। এই গৌরবের পথে দেখি প্রজন্মের জীবনবোধ ও সৃজনশীলতা সবল ও কল্যাণকর মাধুর্য নিয়ে পল্লবিত হচ্ছে, হচ্ছে পৃথিবীজুড়ে। বাংলাদেশি আজ পৃথিবীর মানুষের সকল ভালো-মন্দের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিতে পারে; যখন তাদের সাফল্যের খবর শুনি, তখন অনুধাবন করি, পঞ্চাশ বছরের এই সাফল্য আসলেই অসামান্য।

বাংলাদেশি ও তার উত্তরাধিকার দেশে-বিদেশে চিরকাল জাগরণের স্পৃহাকে তীব্র ও ঈর্ষণীয় করে তুলবে-আমি আগামীর পথে এই দেখি।

-লং আইল্যান্ড, ২১ মার্চ ২০২১