স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে ফাটল?

শ্রিংলার বাংলাদেশ সফর!

শামসাদ হুসাম : আগেভাগে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, আসলে শিরোনামে ব্যবহৃত কথাটা আমার নয়। আমাদের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় নিকট অতীতে ভারতের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়ন নিয়ে জনৈক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তেমন জবাবই দিয়েছিলেন! বলেছিলেন, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক হচ্ছে ‘স্বামী-স্ত্রী’ সম্পর্কের মতো। তার জবাবের মাজেজা হয়তো তেমনটা ছিলো, এই যেমন আমরা খুব সাধারণ মানুষ যেরকম বুঝে থাকি, যেমন, খুব ঝগড়াঝাটির পরে কোন কোন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ফাটল বিছানায় গেলে ফিলাপ হয়ে যায়। তবে বলতে দ্বিধা নেই, মন্ত্রী মহোদয়ের বক্তব্য শুনে কানে আঙুল দিতে ইচ্ছে করলেও এবারকার বিষয়টা মনে হচ্ছে একটু অন্যরকম।
সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা যিনি কিনা বছর কয়েক আগে ঢাকায় ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করে গিয়েছিলেন, সেই সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব করোনাক্রান্ত সময়কালে হঠাৎ করেই ঢাকায় এসে উপস্থিত! সেহেতু করোনাজনিত কারণে সাধারণ ফ্লাইট বন্ধ, তাই সম্মানিত মেহমান বিশেষ ফ্লাইটে করেই ১৮ আগস্ট ঢাকায় এসে নামলেন। তার আসার খবরটি আগে ভাগে জানানো হয়নি মিডিয়া বা অন্যকোন মাধ্যমকে। শোনা গিয়েছিলো তার সফরের মেয়াদকাল হবে সাকুল্যে একদিনের মতো। রাষ্ট্রীয় মেহমানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় একটি প্রটোকলের বিষয় রয়েছে, কিন্তু দেখা গেলো বাংলাদেশ সরকারের কোন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে গেলেন না। কেবলমাত্র ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত রীভা গাঙ্গুলি বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে তাকে বরণ করলেন। বিষয়টা বেশ দৃষ্টিকটূ ঠেকলেও ইঙ্গিতপূর্ণ ছিলো। তার আরো একটা কারণ, পিছনে ইন্ধন জোগালো, আর তা হলো আমাদের দেশের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি. মোমেন, যিনি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে কোন বক্তব্য দিতে গেলে একেবারে লাগাম ছাড়া কথা বলেন, সেই তিনি ঐদিন সিলেট গিয়ে যেনো স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে বসে থাকলেন! কথায় বলেÑ ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’। অনেকের কাছে এই রকমটা মনেও হলো। তারও একটা কারণ আছে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করার আবেদন জানিয়েও যখন যথাসময়ে তার কোন সুরাহা হলো না, তাই শ্রিংলাকে অপেক্ষা করতে হলো আরো একটা দিন। ঠিক তখনই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেলো রাজনীতিতে কোন কথাই শেষ করা নয়! না হলে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতবর্ষ, যে দেশটির দাদাগিরি-মোড়লিপনার কাছে বিকি খেয়ে বসে আছি আমরা! না, আমরা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা এবং অবদানকে কখনোই খাটো করে দেখি না, বরং কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি, কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী, বিশেষ করে মোদী সরকারের প্রথম আমল থেকে এ পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশের সাথে যে যে সব কাজ করে চলেছে, নৈতিকতার মানদণ্ডে কোনভাবেই তার মূল্যায়ন হয় না। এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সেই অনৈতিক দাবি পূরণে দেশের স্বার্থকে ভারতের দাবির কাছে জলাঞ্জলি দিয়েছে আপাময় জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে। তাতে আর যাই হোক, শ্রিংলা নাটকের পেছনে সেই বোধদয় কিছুটা হলেও সরকারের ভিতরে কাজ করছে, এমনটা না বোঝার কোন কারণ নেই। মি. মোমেনের ভাষায়Ñ ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘স্বামী-স্ত্রী’র সম্পর্কের মতো না, এতোটা মেরুদণ্ডহীন নয় বাংলাদেশের মানুষ, জোর গলায় এমনটাই বা বলি কি করে? দিনের পর দিন ধরে, বছরের পর বছর ধরে ভারতের আবদার বাংলাদেশের সরকার যেভাবে মেটাতে গিয়ে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েই চলেছিলো, তা নিয়ে পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ তো দেখা যায়নি কোথাও! তারও অবশ্য কারণ রয়েছে। আর তা হলোÑ মুখ খুললেই যদি গুম হওয়ার ভয় থাকে, তবে সেখানে যথেচ্ছারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষাটা জোরালো হয় না। যেমন, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা, অন্যায়ভাবে লুটপাটের কারণে একটা লুটেরা গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি দেশের সাধারণ মানুষের জান আর মাল। বিচারহীনতার কালচার ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নৈতিকতার শেষ চিহ্নটুকু। আর আমজনতা চুপচাপ হজম করছে সবকিছু!
শুরু করেছিলাম ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবধন শ্রিংলার বাংলাদেশ সফর নিয়ে। তিনি এমন এক সময়ে বাংলাদেশে এলেন, যখন চীনের সাথে বাংলাদেশের কয়েকটি স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দেনদরবার চলছে। সারা দুনিয়া এখন করোনা মহামারী নিয়ে বিপর্যস্ত। ভারতে আক্রান্তের হার বাড়ছেই। একই সাথে বাংলাদেশের অবস্থাও মারাত্মক। বাংলাদেশের বিপর্যস্ত অবস্থায় চীন সহায়তার আশ্বাস নিয়ে এগিয়ে এসেছে, ইতিমধ্যে চীনের একটি চিকিৎসক দলও বাংলাদেশে সফর করে গেছেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী চীনের বেসরকারি-সিনোভ্যাক বায়োটেক লিমিটেডের উৎপাদিত করোনার ভ্যাকসিন মানবদেহে পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত অনুমতি দিয়েছে। অবশ্য এই অনুমতি দিতে গিয়ে সরকার এক মাসের মতো সময় নিয়েছিলো। চীনের প্রতি বাংলাদেশের এই মনোভাব নাড়িয়ে দিয়েছে ভারতের প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে, কারণ বাংলাদেশের বর্তমান সরকার হচ্ছে ভারতপন্থী সরকার, ভারতের আবিস্কৃত ভ্যাকসিন গ্রহণ না করে চীনের প্রতি এই ঝুঁকে পড়ার বিষয়টা মানতে পারছে না তারা কিছুতেই! এই চুক্তিটা এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন লাদাখ সীমান্তে চীন-ভারত সংঘর্ষের উত্তেজনা প্রসমিত হয়নি। অথচ ঐ সংঘর্ষের সময়ে বাংলাদেশ কার্যত চুপচাপই ছিলো। কথায় আছে রাজনীতিতে শত্রু-মিত্রের বিভেদ চিরকাল সমান থাকে না। একদিন যে চীন বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলো, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জাতিসংঘের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো দিয়েছে, আজ নিজ দেশের স্বার্থে বাংলাদেশের পাশে অবস্থান নিয়েছে তারাই।
মূলত নিজেদের ভৌগলিক স্বার্থে সোভিয়েত ইউনিয়নের আধিপত্য প্রতিহত করার লক্ষ্য নিয়ে ঐ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিলো, ঠিক একই কারণে ভারতের শক্তি খর্ব করার ইচ্ছা নিয়েই চীন অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলো। ভারত যে শুধু মানবিকতার কারণে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলো এমনটা মনে করারও কারণ নেই। অখণ্ড পাকিস্তান ভাঙানোয় ভারতের বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক ফায়দার বিষয়টাও মাথায় ছিলো তাদের। শেখ সাহেব যদি ’৭২ সালে স্বশরীরে দেশে ফেরৎ না আসতেন, তবে এটা মানতেই হবে, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতীয় সৈন্যদের ফেরৎ না নিয়ে সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া ছোট এই দেশটাকে তারা তাদের স্বপ্ন অনুযায়ী একটা ‘করদ রাজ্যে’ পরিণত করতে সক্ষম হতো। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে মৌখিক স্বাধীনতা পেয়েছিলো ঠিকই বাংলাদেশ, কিন্তু ’৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে যখন লণ্ডন হয়ে দিল্লিতে এলেন, সেই সময়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে তিনবারের মতো তার জিজ্ঞাসার জবাবে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীকে বাংলাদেশের মাটি থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার সময় নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। তার নেতৃত্বসূলভ মনোভাবেই সক্ষম হয় বিষয়টা। জাতির কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ শেখ সাহেবের কাছে যে, তাঁর কারণেই বাংলাদেশ রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিলো ঐ সময়কালে, না হলে কাশ্মিরের মুসলমানের যে অবস্থা হচ্ছে, বাংলাদেশের জনগণের সেই অবস্থাই হতো। তবে সরাসরি ‘করদ রাজ্যে’ পরিণত না করতে পারলেও বিগত সময়ের প্রায় সবগুলো সরকারই ভারতের প্রতি কমবেশি আনুগত্য দেখিয়েছে। আর বর্তমানে ভারতপন্থী সরকারের কার্যকলাপে আগের সবগুলো সরকারের কাজ ম্লান হয়ে গেছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ভারত শুধু বাংলাদেশকে ভাতে মারতে চায়নি, পানিতে মেরেও আধ মরা করে রেখেছে। ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান হিমালয়ের নিচে, যে কারণে বাংলাদেশের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত প্রায় ৫৪টি নদীর উৎপত্তিস্থল হচ্ছে হয় হিমালয় অথবা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়। এই ৫৪টি নদীর ভিতরে ৪৭টি নদীতে ভারত বাঁধ দিয়ে রেখেছে। শুকনো মৌসুমে তারা বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখে, আর বর্ষা মৌসুমে বাঁধের মুখ খুলে দিয়ে বন্যায় ভাসিয়ে দেয় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ জনপদসহ ক্ষেতের ফসল। পরিকল্পিতভাবে ঐসব বাঁধের কারণে বাংলাদেশকে তারা মরুভূমিতে পরিণত করতে চায়। ভারত এতো বড় দেশ যে, ঐসব নদী নিয়ে আন্তর্জাতিক কোন শর্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নারাজ তারা। তাই মণিপুর সীমান্তের টিপাই মুখ বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে সারা সিলেট অঞ্চলকে মরুভূমিতে পরিণত করার বেলায় শুধু বদ্ধপরিকর তাই নয়, তিস্তা নদীর পানি নিয়েও চরম এক টালবাহানা অব্যাহত রেখেছে। ভারতের সোলামো লেক থেকে উৎপন্ন হয়ে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তিস্তা রংপুর জেলার ভিতর দিয়ে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্র নদের সাথে মিলিত হয়ে সাগরে গিয়ে মিশেছে। এই নদীর উপর ভারতীয় বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশ অংশে শুকনো মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে পড়ে, আর যথারীতি বর্ষা মৌসুমে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয় নদী তীরবর্তী জনপদ। এই নদী নিয়ে ভারতের সাথে বিরোধ দীর্ঘদিনের। ১৯৮৭ সালের পর কয়েক দফা যৌথ নদী কমিশনের মধ্যকার আলোচনা হলেও সুরাহার কোন খবর নেই। অধিকন্তু ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এক সংক্ষিপ্ত সফরে ঢাকায় এসেছিলেন, তার সাথে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিরও আসার কথা ছিল।
সেই সময়ে ঐ দুই নেতার উপস্থিতিতে তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য চুক্তি স্বাক্ষরের কথা, কিন্তু মনমোহন সিং আসলেও মমতা ব্যানার্জি আসলেন না, ফলে চুক্তির খাতায় সই পড়লো না কারোরই!
২০১৫ সালে মমতা ব্যানার্জি ঠিকই ঢাকায় আসলেন, কিন্তু তিস্তার পানি নিয়ে কোন মিমাংসা হলো না। কারণ মমতা ব্যানার্জির ভাষ্যমতে, ‘কলকাতা বন্দরের নাব্যতা সংকট মোকাবেলায় তাদের তিস্তার পানির প্রয়োজন রয়েছে, অতএব এ নিয়ে তিনি কোন কথা বলবেন না’।
পরবর্তীতে মোদী সরকার প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসে এ বিষয় নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, তখনও মমতা ব্যানার্জি সায় দেননি। ভারতীয় আইনের ধারা অনুযায়ী কোন রাজ্যের অনুমোদন ছাড়া কেন্দ্র এককভাবে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, ঠিক সেই কারণে দীর্ঘদিনের এই দাবিটি বাস্তবায়িত হলো না।
তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী, যেহেতু দুটি দেশের ভৌগলিক সীমানার মধ্যে পড়েছে, অতএব এ নিয়ে আন্তর্জাতিক একটি আইন রয়েছে। যেমন, জাতিসংঘের পানি কনভেনশন অনুযায়ী অভিন্ন নদীর প্রবাহে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী কোন পদক্ষেপ কোন রাষ্ট্র এককভাবে নিতে পারে না।
এছাড়া ১৯৬৯ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অন দ্যা ল অব ট্রিটিজির নয় নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত রয়েছে যে, ‘দুটি দেশ ন্যায়পরায়ণতা, ন্যায্যতা ও কারো ক্ষতি নয় এমন নীতির উপর ভিত্তি করেই অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগিতে একমত হতে হবে’। এসব নিয়মনীতির থোঁড়াই তোয়াক্কা করে ভারত। তাই ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে ৪৭ নদীর উপর একতরফা সিদ্ধান্ত মতে বাঁধ নির্মাণ করে ফেলেছে দেশটি। এখন এই পানি সমস্যা বাংলাদেশের জন্য জীবন-মরণ সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশে নদীটির বিস্তৃতি ব্যবস্থাপনা ও পুনরুজ্জীবন প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যার নাম তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট এ্যান্ড রেস্টোরেশন। ইতোমধ্যে চীনের সাথে সরকারের এই বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে আট হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে ঐ প্রকল্পটি চীন সরকারের ঋণ সহায়তায় পরিচালিত হবে। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে শেখ হাসিনা যখন বেইজিং সফরে গিয়েছিলেন, তখন তিস্তা প্রকল্পে (খননসহ অন্যান্য) সহায়তা করার অনুরোধ জানালে চীন তার আবেদনে সাড়া দিয়ে এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছিলো।
চীনের ঐ প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে আসার সময়কালটা ভারতের জন্য চরম এক দুঃসময়; বিশেষ করে চীন, নেপাল ও পাকিস্তানের ত্রিমুখী চাপে পড়ে ভারত যখন মানসিকভাবে চরমভাবে বিপর্যস্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে চীনের সাহায্য নিয়ে তিস্তা নদী প্রকল্প বাস্তবায়নের বাংলাদেশের এই সাহস ভারতের কাছে একটা ক্ষমাহীন বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব বিষয়কে মাথায় নিয়েই শ্রিংলার বাংলাদেশ সফর। ভারতের সুবিধাবাদী মনোভাবের পরিচয় কি বাংলাদেশ জানে না? জানে অবশ্যই। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের কাছ থেকে বিনাশুল্কে ট্রানজিট সুবিধা আদায় করাসহ, পর্যটন খাতে বাংলাদেশের ভূমিকা, ভ্রমণ কর, ভ্রমণ খরচ, চিকিৎসা খরচের যে পরিমাণ, তা গণনার বাইরে।
অধিকন্তু বেসরকারি হিসাব মতে, প্রায় পাঁচ লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত রয়েছে। এই বিপুল অংকের টাকা ভারতের সামগ্রিক উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখলেও প্রতিদিন সীমান্তে বিএসএফ-এর হাতে নিরীহ বাংলাদেশি খুন হওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম সহানুভূতি দেখায় না দেশটি। আয়তনের বিশালতা নিয়ে ক্ষুদ্র প্রতিবেশী দেশসমূহের প্রতি সীমাহীন অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় রোজ রোজ?
শ্রিংলার প্রতি, বাংলাদেশের অবজ্ঞা প্রকাশের ফল যাই হোক, আমরা সাধুবাদ জানাই বাংলাদেশ সরকারের প্রতি। একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষ হিসেবে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াবার এই প্রয়াস আমাদেরকে অন্যের কাছে ছোট হওয়ার গ্লানি থেকে যেনো রক্ষা করে, মনে হয় করেছেও।