স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে জাগ্রত অগ্রপথিক অনন্য

এস এম মোজাম্মেল হক :

ঐতিহ্য বা প্রথা হলো একটি চলমান প্রক্রিয়া। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কাজের ধারাবাহিকতাই একসময় ঐতিহ্যে পরিণত হয়। ঐতিহ্যকে সব সময় ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের চলমান বা বহমান রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংস্কৃতি ঐতিহ্যের একটি অন্যতম শাখা। যে কারণে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বলতে কোনো সমাজের সাংস্কৃতিক জাগরণ, বিশেষ করে নির্দিষ্ট কোনো ভাষাভাষীর সামগ্রিক অগ্রগতি ও প্রবহমানতাকেই নির্দেশ করে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ন্যায় পারিবারিক, বংশীয়, আঞ্চলিক, দেশীয় এমনকি আন্তদেশীয় ঐতিহ্যেরও বহু নিদর্শন বিদ্যমান।

‘জাগ্রত অগ্রপথিক’ গ্রামভিত্তিক অরাজনৈতিক ও অলাভজনক একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, যার কার্যক্রম ও ব্যাপ্তি ক্ষুদ্র পরিসওে হলেও এটির প্রশংসনীয় কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সারা দেশে এ রকম বহু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে উঠতে পারে। সেই বিবেচনা থেকেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম তুলে ধরা।

বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলাধীন হস্তীশুণ্ড একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। আদিকাল থেকে যেখানে অনুকরণযোগ্য বহু ভালো কাজের দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। গ্রামটি শিক্ষাদীক্ষা, সামাজিক ন্যায়নীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে অনন্য। সাবেক আমল থেকেই এখানে শান্তশিষ্ট পরিবেশ বিদ্যমান। থানা বা কোর্ট-কাছারিতে মামলা-মোকদ্দমা করার মতো এখানে তেমন নজির নেই।

কারণ এ গ্রামে বসবাসকারী লোকজন অত্যন্ত নিরীহ, তদুপরি তাদের মধ্যে কখনো পারস্পরিক কোনো ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হলে নেতৃত্বদানকারী মুরব্বিরা স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা-মোকদ্দমায় গড়ানোর আগেই বিচার-সালিসের মাধ্যমে সমাধান করে দিতেন। এমন মহৎ কাজে যাদের সর্বাধিক অবদান ছিল, তার মধ্যে জনাব হাজী মহব্বত আলী শিকদার, জনাব আসমত আলী বালি, জনাব মনসুর আলী খলিফা (প্র. ডশ.), জনাব মোহাম্মদ আলী তালুকদার, জনাব জয়নাল আবেদীন হাওলাদার অন্যতম। তাদের বার্ধক্যের কারণে নতুন করে আরো অনেকে এমন মহৎ কাজে এগিয়ে আসেন।

বাংলাদেশের অপরাপর গ্রামের মতো এ গ্রামেরও শতভাগ পরিবার আর্থিকভাবে সচ্ছল নয়। তা সত্ত্বেও সচ্ছল পরিবারগুলো বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সাধ্যমতো দরিদ্র পরিবারের সাহায্যে এগিয়ে আসা ছিল সামাজিক রেওয়াজতুল্য, যে কারণে এই গ্রামে ধনী-দরিদ্রের তেমন বৈষম্য ছিল না এবং দরিদ্রদের মধ্যে কখনো অসহায়ত্ব ভর করত না। পিতামহ হাজী মহব্বত আলী শিকদার ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে আমার জন্মের পূর্বে অর্থাৎ ১৯৬০ সালের পূর্বেই হজব্রত পালন করেন এবং ইসলামি বিধান মোতাবেক জাকাত ও অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রম যথাযথভাবে পালন ব্যতিরেকেও যেকোনো সময় অভাবী মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা করা ছিল তার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। গ্রামে তার ন্যায় দরিদ্রবান্ধব আরও অনেকে ছিলেন এবং তাদের উত্তরসূরিসহ বর্তমানে আরও অনেকে রয়েছেন।

‘জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’ এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করেই জাগ্রত অগ্রপথিকের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পিতা, পিতামহের একমাত্র ছেলেসন্তান হওয়ার কারণে পিতার অবর্তমানে আমরা সাত ভাইবোন সকলেই আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও আত্মীয়স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের প্রতি পিতা, পিতামহের মতো সদয় দৃষ্টিভঙ্গি সব সময় রয়েছে। দেশে পৈতৃক বাড়িঘর ও ভিটেমাটি এবং চাষযোগ্য জমির ফসল থেকে প্রাপ্ত অর্থ দেশেই দান-অনুদান এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে ব্যয়িত হয়। তা ছাড়া এখান থেকে প্রতিবছর পরিবারের সবার পক্ষ থেকে কয়েক লাখ টাকা বিভিন্ন পর্যায়ে দানের লক্ষ্যে দেশে প্রেরণ করা হয়। (দানের বিষয়টি গোপনে করার নির্দেশ থাকলেও অন্য অনেকে বিষয়টি জানার কারণে উদ্বুদ্ধ হতে পারে এই বিবেচনা থেকে প্রকাশ করা হলো, ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে নয়)।

সংগঠনটি গঠনের পূর্বে এককভাবে পরিবারের পক্ষ থেকে দান-অনুদান প্রদানের পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বর্তমানে সংগঠনের যৌথ ব্যবস্থাপনায় তা পরিচালিত হয় এবং সংগঠনের বাইরে ব্যক্তিগত পর্যায়েও দানের হাত সম্প্রসারিত থাকে। দেশে বসবাসকারী উৎসাহী ব্যক্তিবর্গসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বহু প্রবাসী নাগরিক সংগঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যাদের সংখ্যা ৫৪ জন।

এর মধ্যে বিদেশে অবস্থানকারী ১০ জন ও বাকি ৪৪ জন দেশে অবস্থান করছেন। তবে তারা আর্থিক সহায়তা ও কমিটির বিভিন্ন পদে থাকলেও উপদেষ্টার ভূমিকা পালন ব্যতীত বাকি কার্যক্রম দেশে অবস্থানকারী অন্য সক্রিয় সদস্যরা পালন করে থাকেন। এলাকার দরিদ্র পরিবারবর্গের আর্থিক সহায়তা ছাড়াও ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময় ঈদ উৎসব পালনের জন্য সহায়তা সামগ্রী ও অসচ্ছল পরিবারের মেয়েদের বিয়েতে সহায়তা ছাড়াও গৃহ নির্মাণ ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে।

এ ছাড়া সামাজিক কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে এলাকার চলাচল অনুপযোগী রাস্তাঘাট মেরামত, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহায়তা প্রদান, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা, বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষার ফি প্রদান এবং সামাজিক, ধর্মীয় ও এলাকার সড়কের দুই পাশে বৃক্ষ রোপণ কার্যক্রম পরিচালনা। এর সদস্যরা এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে এবং আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডে বিরামহীনভাবে অবদান রেখে আসছেন। ২০২০ সালের জুন মাসে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সংগঠনটি এলাকায় ১৩ লক্ষাধিক টাকার কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। এর আওতায় এককভাবে ৭ সহস্রাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সংগঠনটির সহায়তা প্রাপ্ত হয়েছে। এসবের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো :

-৬টি ভাঙা রাস্তা মেরামতের ব্যবস্থা করা;
-৪ জন দরিদ্র লোককে গৃহ নির্মাণে অর্থ সহায়তা প্রদান করা;
-১২ জন অসুস্থ লোককে চিকিৎসায় অর্থ সহায়তা প্রদান করা;
-৩৭ জন শিক্ষার্থীকে অর্থ সহায়তা প্রদান করা;
-৩ জন বেকার লোকের চাকরির ব্যবস্থা করা;
-১ জন দোকানিকে মালামাল কিনে দিয়ে ব্যবসায়ে পুনর্বাসন করা;
-৫টি মাদ্রাসা ও মসজিদ নির্মাণে অর্থ সহায়তা প্রদান করা;
-৮০০ জন শীতার্তের মধ্যে কম্বল বিতরণ করা;
-৬ শতাধিক লোকের মধ্যে রমজান ও ঈদে ইফতারি ও বস্ত্র বিতরণ করা; এবং
-৭ হাজার লোককে করোনা মহামারিতে তিন দফায় কোভিড-১৯ রেজিস্ট্রেশন ও ভ্যাকসিন প্রদানের ব্যবস্থা করা।

সংগঠনটি এলাকার গণ্ডি ছাপিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে, যার ফলে ১৫ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে অসহনীয় গরম, রোজার ক্লান্তি ও নিজেদের কাজকর্ম রেখে ছুটির দিনের বিশ্রাম পরিত্যাগ করে স্থানীয় দরিদ্রদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জানাবা ফারিহা তানজিন, উপজেলা সমাজসেবা অফিসার জনাব আবুল কালাম আজাদ ও বামরাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব মো. ইউসুফ হাওলাদারের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।

সংগঠনের এমন মহৎ কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চলমান থাকার প্রতি সংশ্লিষ্ট সকলে অঙ্গীকারবদ্ধ। আশা করা হচ্ছে দেশের অন্যত্রও এমন মহৎ কার্যক্রম পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট এলাকার হৃদয়বান ও উদ্যমী ব্যক্তিরা এগিয়ে আসবেন। তাহলেই যুবসমাজ নৈরাজ্য থেকে বেরিয়ে এসে ভালো কাজে আত্মনিয়োগের সুযোগ পাবে। এই প্রত্যাশা দেশের সর্বত্র সঞ্চারিত হোক।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও গবেষক।

কুইন্স ভিলেজ, নিউইয়র্ক