হত্যার শিকার নদী

ঠিকানা ডেস্ক : নদীই জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশকে। তাই নদীমাতৃক দেশ আমাদের। কিন্তু এই নদীমাতাকে অহরহ অবলীলায় হত্যা করে চলেছে তার সন্তানরা। শহরের নদীগুলোর হত্যাযজ্ঞ প্রায় শেষ। গ্রামগঞ্জেও থেমে নেই নদী হত্যা। এই মা হত্যার বিচার কী? আজ হাইকোর্টের দিকে তাকিয়ে সবাই।

খুলনা নদী দখল করে ২৭ ইটভাটা

খুলনা : শুকিয়ে যাওয়া নদীর তীর দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে নানা ধরনের স্থাপনা। এর মধ্যে অন্যতম অবৈধভাবে গড়ে তোলা ইটভাটা। এসব ইটভাটার জন্য মাটি সংগ্রহ করতে নদীর ক‚লে দেওয়া হচ্ছে অস্থায়ী বেড়িবাঁধ। ফলে নদী দখলের পাশাপাশি বেড়িবাঁধের বিপরীত পাশে সৃষ্টি হয় ভাঙন। ধনুকের মতো বেঁকে আরো বিপন্ন হয়ে পড়ে নদী। এভাবে খুলনা জেলার পাঁচ উপজেলায় নদীর তীর, নদী-ভরাটি চরে গড়ে তোলা হয়েছে ২৭টি ইটভাটা।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) ওই পাঁচটি উপজেলার ছয়টি নদ-নদীর সীমানা দখল করে গড়ে তোলা ২৭টি ইটভাটার তালিকা তৈরি করেছে। উপজেলাগুলো হচ্ছে ডুমুরিয়া, তেরখাদা, রূপসা, দিঘলিয়া ও ফুলতলা। আর নদীগুলো হচ্ছেÑ ভৈরব, আতাই, ভদ্রা, তেলিগাতী, হরি ও শৈলমারী। এসব ইটভাটা অপসারণে পাউবো খুলনা অফিস থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে পাউবো বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। নদীর অন্য পাশে ভাঙন দেখা দিচ্ছে। নাব্যতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হচ্ছে।’

সরেজমিনে গিয়ে ভৈরব নদীর রূপসা পাড়ে দেখা গেছে, নদী তীরের যুগিহাটী গ্রামে কেবিসি এবং এনকেবিসি নামের দুটি ইটভাটা। ভাটা দুটি নদীটির উল্লেখযোগ্য অংশ গিলে ফেলেছে। ফলে পাউবোর বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের বড় একটি অংশ বিলীন হয়ে গেছে। ইটভাটার পাশে চরের জমিতে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির সারি সারি চুল্লি। পাশে জ্বালানির জন্য স্তূপ করে রাখা কাঠ। ইটভাটার কারণে ভৈরবের তীর ঘেঁষে ২১ কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। পাশের শোলপুর গ্রামটি নদী ভাঙনে পড়েছে। যুগিহাটী গ্রামটিও এ কারণে বিপর্যয়ের মুখে। গ্রামটির রাস্তার পাশে একটি খাল ছিল। সেটিও কয়েক বছর আগে দখল করে নেয় ইটভাটা মালিক।

স্থানীয়রা কেউ ইটভাটা মালিকের বিরুদ্ধে কিছু বলতে সাহস করে না। খালটি দখল করে ভরাট করায় বর্ষাকালে পানি আটকে ওই এলাকার মানুষ সমস্যায় পড়ে। ভারী বৃষ্টি হলে যুগিহাটী ও দেয়াড়া গ্রামের শতাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়ে। বসতভিটা এবং চলাচলের রাস্তায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইচগাতী ইউনিয়ন পরিষদের একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, ‘২০১৬-১৭ অর্থবছরে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে জনগণের চলাচল ও পানির প্রবেশ ঠেকাতে ইটভাটার পাশে একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু ইটভাটার মালিকের লোকেরা ওই বেড়িবাঁধের মাটি কেটে ইট তৈরির কাজে ব্যবহার করে।

ডুমুরিয়ার খর্নিয়ার ভদ্রা নদীর পাড়েও সারি সারি ইট ভাটা। ভদ্রা নদীর ওপর সেতুতে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ দিকে তাকালে চোখে পড়ে, নদীর পশ্চিম পাশের দুটি ইটভাটার মাটি সংগ্রহ করতে নদীর মাঝখান বরারবর দখল করা হয়েছে। ফলে নদীটি ধনুকের মতো বেঁকে গেছে। ফলে পূর্ব পারে সৃষ্টি হয়েছে ভাঙন। বর্তমানে নদীটি প্রায় স্রোতহীন হয়ে ক্ষীণকায় হয়ে পড়েছে। একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েও নদীর পার দখলমুক্ত করা যায়নি।

গত ২০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত খুলনা জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভায় খর্নিয়া ব্রিজের ভাটিতে ভদ্রা নদীর তীরের ওই ইটভাটাগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর গত ৩০ ডুমুরিয়া উপজেলার পশ্চিম শোভনা ইউনিয়নে ভদ্রা নদীতে (খর্নিয়ার দক্ষিণে) গড়ে তোলা ‘এবি ইটভাটা’ উচ্ছেদ করা হয়েছে। এই ইটভাটার কারণে ভদ্রা নদীখনন প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছিল।

রাজবাড়ী পদ্মাসহ ৫ নদী ধু ধু বালুচর

রাজবাড়ী : উজানে পানি প্রত্যাহার, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কারণে রাজবাড়ীতে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে প্রমত্তা পদ্মা এবং একসময়ের খরস্রোতা গড়াই, চন্দনা, হড়াই ও চত্রা নদী। এই পাঁচটি নদী নাব্যতা হারিয়ে ধু ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। যদিও নদীগুলো বাঁচাতে ড্রেজিং বা খননকাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

পদ্মা নদীতে একসময় ইলিশের ছড়াছড়ি থাকলেও পানিশূন্যতার কারণে এখন ইলিশ তো দূরের কথা স্বাদু পানির মাছও কমে গেছে। বর্ষা মৌসুমে মাছ মিললেও শুকনা মৌসুমে মাছের আকাল পড়ে যায়। রাজবাড়ী শহরের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া প্রায় ৮৫ কিলোমিটার নদীর দশা করুণ। বড় লঞ্চ বা কার্গো এখন কম চলে। পাবনার সঙ্গে নদীপথে যোগাযোগের একমাত্র ফেরি সার্ভিস (ধাওয়াপাড়া-নাজিরগঞ্জ ফেরিঘাট) বন্ধ হওয়ার পথে। উন্মুক্ত নদীতে মাছ শিকার করতে না পেরে হাজার হাজার জেলে ও মৎস্য শিকারি পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। একই পরিণতি দাঁড়িয়েছে জেলার গড়াই, চন্দনাসহ বিভিন্ন নদীর। এসব নদী মরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুপাশ দখল করে নিচ্ছে দখলবাজরা। প্রতি বছর বালু জমতে জমতে এখন পুরো গড়াই বিশাল বালুচরে পরিণত হয়েছে। ফলে এ অঞ্চলের পরিবেশ এবং কৃষক ও জেলেদের জীবন-জীবিকায় নেমে এসেছে বিপর্যয়।

সরেজমিন দেখা গেছে, গড়াই ও চন্দনায় মাইলের পর মাইল জেগে উঠেছে বিশাল বালুচর। নদীতে নেই কোনো স্রোত, নেই গভীরতা। অনেক জায়গায় নদীগুলোর বুক দিয়ে চলছে বালুবোঝাই ট্রাক ও ট্রাক্টর। অনেক কৃষক আবার জেগে ওঠা চরে ইরি-বোরো ধান রোপণ করছে। নদীতে শুধু দেখা মেলেনি মাছ ধরার নৌকা ও জেলেদের জাল।

রাজবাড়ী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুরে সরকার গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। তবে বর্তমানে ওই প্রকল্পটির কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, নদীগুলোর নাব্যতা ফেরাতে তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। এরই মধ্যে পদ্মা, চন্দনা, হড়াই, চত্রা নদীসহ জেলার বিভিন্ন খালের নাব্যতা ফেরাতে ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এতে নদীগুলো পুনরুজ্জীবিত হবে। সেই সঙ্গে এ অঞ্চলের মৎস্য ও কৃষি অর্থনীতিতে ব্যাপক উন্নয়ন হবে।

মানিকগঞ্জ ধলেশ্বরীর জীবন নিয়ে শঙ্কা

মানিকগঞ্জ : একসময় বর্ষা মৌসুমে ঢেউয়ের গর্জনে রাতে ঘুমাতে পারত না ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী জনপদের মানুষ। নদীর বুক চিড়ে ছুটে চলত স্টিমার, বড় লঞ্চ, কার্গো, কয়েক শ মণ মালবাহী পাল তোলা নৌকা। শুশুক আর মেছো কুমিরের দেখা মিলত অহরহ। সারা বছরই নদী থাকত টইটম্বুর। শুধু গৃহস্থালি কাজেই নয়, পানীয় জল হিসেবেও ব্যবহার করা হতো ধলেশ্বরীর পানি। প্রবীণদের স্মৃতিচারণা, পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখা আর ‘মানিকগঞ্জের ইতিহাস’ বই থেকে ধলেশ্বরী নদীর এমন চিত্রই পাওয়া যায়। কিন্তু সেসব কথা বিশ্বাস করতে কঠিন হয় তরুণ প্রজন্মের। কারণ ভরাট হতে হতে নদীটি এখন মৃতপ্রায়।

শুধু এই নদী বাঁচাতেই মানিকগঞ্জে গড়ে উঠেছে ‘ধলেশ্বরী নদী বাঁচাও আন্দোলন’ নামের একটি সংগঠন। ধলেশ্বরী বাঁচাতে না পারলে মানিকগঞ্জের পরিবেশ ও আর্থসামাজিক অবস্থার বিপর্যয় ঘটবে বলে মনে করে সংগঠনটি।

ধলেশ্বরী নদী বাঁচাও আন্দোলনের এক জরিপে দেখা গেছে, তিল্লির কাছে চর জেগে ওঠায় বর্ষা মৌসুমেও পানি ঢুকতে পারছে না ধলেশ্বরী নদীতে। ফলে ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী। সেই সুযোগে নদীর জমি দখল হয়ে যাচ্ছে। গড়ে তোলা হচ্ছে কলকারখানা। কারখানার বর্জ্যে দূষণের শিকার হচ্ছে নদী। ‘তিল্লি মুখ’ খনন করে বালুচর অপসারণ না করা হলে কয়েক বছরের মধ্যে নদীটি স্থায়ীভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে অশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে জরিপ প্রতিবেদনে। ধলেশ্বরী বাঁচাতে তিল্লি মুখ খনন করারও দাবি জানানো হয়েছে।

ওই সংগঠনের যুগ্ম আহŸায়ক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস জানান, তিল্লি মুখ থেকে মানিকগঞ্জের জাগীর সেতু পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার নদী এখন নালার আকার ধারণ করেছে। বছরজুড়েই নদীর বুকে চাষাবাদ হয়। তিনি বলেন, ধলেশ্বরীর মানিকগঞ্জ অংশে ৬০ কিলোমিটারের সবখানেই প্রায় একই অবস্থা। নদী দখল করে অসংখ্য ইটভাটা, কলকারখানা এমনকি একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো হয়েছে। এ ছাড়া কারখানার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে।

গত বছরের ২৬ জুন মানিকগঞ্জ জেলা নদী রক্ষা কমিটির এক সভা হয় জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে। ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার ও সদস্য মো. আলাউদ্দিন। তিল্লি মুখ থেকে এক কিলোমিটার নদী খনন, নদীর অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি এবং সীমানা পিলার স্থাপন করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াসহ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হয় সভায়।

এ বিষয়ে ধলেশ্বরী নদী বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আজাহারুল ইসলাম আরজু বলেন, ‘সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে আমরা কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখছি না।’ তিনি বলেন, কাগজে-কলমে বড় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও ধলেশ্বরী নদী দখল, দূষণ অব্যাহত আছে। ধলেশ্বরীকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে কি না তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।

মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন সম্পাদিত মানিকগঞ্জের ইতিহাস বই থেকে জানা যায়, টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর উপজেলায় যমুনা নদী থেকে একটি খাত ধলেশ্বরী নাম ধারণ করে মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলায় ঢুকেছে। সাটুরিয়ার তিল্লি ইউনিয়নের তিল্লি গ্রামের কাছে ধলেশ্বরী নদীর একটি খাত কালীগঙ্গা নাম ধারণ করে ঘিওর উপজেলার দিকে প্রবাহিত হয়েছে। অন্য খাতটি ধলেশ্বরী নাম ধারণ করে মানিকগঞ্জ সদর, সিঙ্গাইর, সাভার হয়ে একটি খাত ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে মিশেছে। অন্য একটি খাত মুন্সীগঞ্জের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মেঘনায় পতিত হয়েছে। উৎসমুখ টাঙ্গাইল থেকে মুন্সীগঞ্জে মেঘনা নদীতে পতিত হওয়া পর্যন্ত ধলেশ্বরী নদীর দৈর্ঘ্য ১৬৮ কিলোমিটার।

ঝালকাঠি জীবনানন্দের ধানসিঁড়ি এখন মরা খাল

রাজাপুর : ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়/হয়তো মানুষ নয়হয়তো-বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে’।

প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশের অমর সৃষ্টি ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতায় উঠে আসা নদীধানসিঁড়ি। ঝালকাঠি থেকে রাজাপুর পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার বয়ে চলা নদীটির দুই পারের অপার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে কবি তার কবিতার মধ্য দিয়ে আবারও শঙ্খচিল বা শালিখের বেশে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন এই নদীতীরে। অথচ কবির আরাধ্য সেই ধানসিঁড়ি আজ মরা খাল। দিনে দিনে নাব্যতা হারিয়ে শীর্ণ থেকে শীর্ণকায় হয়ে এটি ধুঁকছে অস্তিত্ব সংকটে।

সময়মতো খনন না হওয়া, অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়া, পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে ধানসিঁড়ির দৈর্ঘ্য এখন চার কিলোমিটারে নেমে এসেছে। এই অংশটুকুতে কোনোক্রমে পানিপ্রবাহ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে একসময়ের খরস্রোতা ধানসিঁড়ি। বর্ষায় কিছুটা প্রাণের সঞ্চার হলেও শীত মৌসুমে পানিপ্রবাহও বন্ধ হয়ে প্রাণহীন হয়ে পড়ে রূপসী বাংলার এই নদী। দূর-দূরান্ত থেকে বহু দর্শনার্থী আজও কবির প্রিয় ধানসিড়ি নদী দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছে।

ধানসিঁড়ি নদীর ইতিহাস : ঝালকাঠির সুগন্ধা নদী যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে গাবখান চ্যানেল ও বিষখালী নদী শুরু হয়েছে। এই তিন মোহনা থেকে উত্তর-পশ্চিমে বয়ে চলা জলধারার নাম ধানসিঁড়ি। ঝালকাঠির মোল্লাবাড়ি ও ছত্রকান্দা গ্রামের ভেতর থেকে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ও রাজাপুরের বাড়ইবাড়ি, পিংড়ি, হাইলাকাঠি, ইন্দ্রপাশা ও বাঘড়ী গ্রামের মধ্য দিয়ে বাকি আট কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাজাপুর সদর খালের মোহনায় মিশেছে ধানসিঁড়ি। সেখান থেকে আরো প্রায় পাঁচ কিলোমিটার গিয়ে জাঙ্গালিয়া নদী হয়ে আবার বিষখালী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে ধানসিঁড়ির প্রবাহ।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে খাল কাটা কর্মসূচির আওতায় স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে নদীটির কিছু অংশ খনন করা হয়েছিল। এরপর আর তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সড়কপথ তৈরির আগে ঝালকাঠি জেলা সদরের সঙ্গে রাজাপুর উপজেলার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল ধানসিঁড়ি নদী। অতীতে এই নদী দিয়ে এক্সপ্রেস সার্ভিসের স্টিমার খুলনা-কলকাতায় যাতায়াত করত। বড় বড় মালবাহী পাল তোলা নৌকা এবং সাম্পানও চলাচল করত ধানসিঁড়ি নদীতে। দুই যুগ আগেও ধানসিঁড়ি নদীতে লঞ্চ ও কার্গো চলাচল করত।

বর্তমান অবস্থা : বর্তমানে রাজাপুর উপজেলার পাড়েরহাট এলাকা থেকে ভরাট হয়ে ধানি জমির সঙ্গে মিশে গেছে ধানসিঁড়ি নদীর বাকি অংশ। তলদেশে পলি জমে ভরাট ও দখলদারির ছোবলে ধীরে ধীরে ধানসিঁড়ি শীর্ণ খালে পরিণত হয়েছে। এই খালে এখন নৌকা চলাচলও করতে পারে না। যেখানে পানি থাকে সেখানেও কচুরিপানায় ভর্তি হয়ে খালের পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। নদীর পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে খননকাজের জন্য তিন বছর আগে ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। সেই প্রকল্পে খালের পার পরিষ্কার করা ছাড়া আর কিছু হয়নি।

ধানসিঁড়ি পারের বাসিন্দা আব্দুল আউয়াল গাজী বলেন, ‘আমাদের ছোটবেলায় এই নদীতে আমরা স্টিমার চলতে দেখেছি। এখন আর নৌকাও চলাচল করতে পারে না। তার পরও যতটুকু আছে তা টিকিয়ে রাখতে প্রশস্ত কলেবরে খননের বিকল্প নেই।’

কৃষক কাশেম হাওলাদার বলেন, ‘এই খালের পানি দিয়েই হাজার হাজার কৃষক মাঠে ফসল ফলিয়েছে। এখন শীতকালে নদীতে পানি না থাকায় আমরা চাষাবাদ করতে পারছি না।’

রাজাপুর নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি সৈয়দ হোসাইন আহমেদ কামাল বলেন, ‘ধানসিঁড়ি আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। এই নদীকে বাঁচাতে আমরা একাধিকবার মানববন্ধন ও প্রশাসন বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছি। আমরা মনে করি নদীটিকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে। কিন্তু কিছু অর্থলোভীর কারণে ধানসিঁড়ি আজ মৃত্যুর মুখোমুখি।’

জীবনানন্দ দাশ ও ধানসিঁড়ি নদী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে আসছেন সাংবাদিক আমিন আল রশীদ। তিনি বলেন, ‘ধানসিঁড়ি নদী নিয়ে দেশের গণমাধ্যমগুলোয় অসংখ্যবার সংবাদ প্রচার ও প্রকাশিত হয়েছে। কখনো ইতিহাস নিয়ে, কখনো বর্তমান অবস্থা নিয়ে। নদীর আগের অবস্থান ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন খনন।’

রাজাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রিয়াজ উল্লাহ্ বাহাদুর বলেন, ‘ধানসিঁড়ির দুই পারে শত শত হেক্টর উর্বর ফসলি জমি থাকলেও নদীতে পানিপ্রবাহ না থাকায় কৃষকরা চাষাবাদ করতে পারছে না। নদীটিতে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে পারলে ধান ও রবিশস্যের ব্যাপক আবাদ সম্ভব।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজা বেগম পারুল বলেন, ‘ধানসিঁড়ি খননের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড বরাবর গত বছরই সুপারিশপত্র দেওয়া হয়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে বরাদ্দ হওয়ার কথা জানিয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। আশা করি শিগগির বরাদ্দ পাব। আর বরাদ্দ পেলেই খননকাজ শুরু করা হবে।’