হাওরাঞ্চলে স্বল্প ওজনের শিশুর জন্ম বেড়েছে

ঠিকানা ডেস্ক : চার দিকে খোলা মাঠ, মাঝে সামান্য উঁচু একখ- জমি। মাত্র ৬০টি পরিবার নিয়ে সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের এ গ্রামেই গত আগস্টে জন্ম লামিয়ার। বাড়িতে জন্ম হলেও সমস্যা দেখা দিলে পরদিনই তাকে নিতে হয় হাসপাতালে। চিকিৎসকেরা তার ওজন মেপে দেখেন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ কম, মাত্র দুই কেজি। এ ছয় মাসে লামিয়ার ওজন কিছুটা বেড়েছে। তার পরও লিকলিকে শরীর দেখে এখনো তিন মাসের শিশুই মনে হয় তাকে। ছোট একটি খুপরিতে বসে লামিয়াকে আদর করছিলেন নানী ফুলঝরি বেগম। কম ওজনের বিষয়ে জানতে চাইলে তার উত্তর বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ার পর জামাই কর্মহীন হয়ে পড়ে। সরকারের দেয়া ৩০ কেজি চাল ও ৫০০ টাকায় চারজনের সংসার চালাতে হয়েছে। নিজেরা যা খেয়েছি, গর্ভবতী মেয়েকেও তা-ই খেতে হয়েছে। বাড়তি কোনো খাবার দেয়া সম্ভব হয়নি। মায়ের এ অপুষ্টিই লামিয়ার কম ওজনের জন্য দায়ী বলে জানান চিকিৎসকেরা। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের মতে। এবারের বন্যায় হাওরে ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। কর্মও হারিয়েছেন অনেকে। এর প্রভাব পড়েছে পুষ্টির ওপর। মায়েদের পুষ্টিকর খাবারের অভাবে স্বল্প ওজনের শিশুর জন্ম আগের চেয়ে বেড়েছে। হাওরে স্বল্প ওজনের শিশু জন্মের হার বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে সংরক্ষিত তথ্যেও। সেখানকার তথ্য বলছে, ২০১৭ সালের এপ্রিলের বন্যার পর মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জেলার ১১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জন্ম নিয়েছে ৩ হাজার ৯৯০টি শিশু। এর মধ্যে ২ হাজার সাতজনই স্বল্প ওজনের। অর্থাৎ এ সময়ে শুধু হাসপাতালেই ৫০ শতাংশের বেশি শিশু স্বল্প ওজন নিয়ে জন্মেছে। বন্যার আগের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে এ হার অনেক বেশি। ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত ছয় মাসে জেলার ১১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জন্মগ্রহণ করে ২ হাজার ৯১০টি শিশু। এর মধ্যে কম ওজনের শিশুর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৩। অর্থাৎ বন্যার আগের ছয় মাসে জেলাটির হাসপাতালে জন্ম নেয়া শিশুর ৩৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ ছিল স্বল্প ওজনের। এ হারও স্বল্প ওজনের শিশুর জাতীয় হারের চেয়ে অনেক বেশি। ন্যাশনাল লো বার্থ ওয়েট সার্ভে ২০১৫ অনুযায়ী, দেশে স্বল্প ওজনের শিশু জন্মের হার ২২ দশমিক ৬ শতাংশ। বন্যার পর হাওরে স্বল্প ওজনের শিশু জন্মহার বেড়ে গেছে বলে জানান সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হেলথ ইন্সপেক্টর বিজয় সরকার। তিনি বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত বছর ৩২০টি স্বল্প ওজনের শিশু জন্ম নিয়েছে। তবে বাড়িতে জন্ম নেয়া শিশু হিসাবে নিলে এ সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাবে। কারণ বাড়িতে জন্ম নেয়া স্বল্প ওজনের শিশুর সংখ্যা অনেক বেশি। হাওরাঞ্চলের মানুষের পেশা মূলত কৃষি। মাছ ধরেও জীবিকা নির্বাহ করেন অনেকে। গত বছরের এপ্রিলের বন্যায় ফসলহানির পর বড় ধরনের প্রভাব পড়ে তাদের জীবিকায়। বন্যার পর ক্ষয়ক্ষতির একটা হিসাব করে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ (ডিডিএম)। হিসাব অনুযায়ী, হাওর অধ্যুষিত ছয় জেলায় তলিয়ে যায় মোট ২ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান। কৃষক ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার কারণে বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় হাওরাঞ্চলের কৃষক ও কৃষি শ্রমিকদের। মৎস্যসম্পদ নষ্ট হয় মোট ২১৩ দশমিক ৯৫ টন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিপুলসংখ্যক গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিও। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সুনামগঞ্জে। পুষ্টি পরিস্থিতি তাই এ জেলায়ই সবচেয়ে বেশি নাজুক। চিকিৎসকদের মতে, জন্মগ্রহণের সময় আড়াই থেকেচার কেজি ওজনকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়। জন্মের পর নবজাতকের ওজন আড়াই কেজির কম হলে তাকে স্বল্প ওজনের শিশু বলে। স্বাভাবিক ওজনের শিশু জন্মদানে গর্ভাবস্থায় মায়েদের সাধারণ সময়ের তুলনায় ২০-৩০ শতাংশ অতিরিক্ত খাবারের প্রয়োজন হয়। সে খাবার হতে হবে অবশ্যই পুষ্টিসমৃদ্ধ। এর ব্যত্যয় ঘটলে স্বল্প ওজনের শিশু জন্মের ঝুঁকি তৈরি হয়। বন্যায় ফসলহানির পর সুনামগঞ্জের গর্ভবতী নারীদের পুষ্টিকর খাবার প্রাপ্তি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলে জানান শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেলাল উদ্দীন। তিনি বলেন, হাওরে নারীদের মধ্যে অপুষ্টির হার এমনিতেই বেশি। বন্যার পর পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে। মায়েদের অপুষ্টির কারণে স্বল্প ওজনের শিশু জন্ম অনেক বেড়েছে। হাওরাঞ্চলের পুষ্টি নিয়ে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। এখানকার শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতির ওপর গত বছর একটি গবেষণাও পরিচালনা করে সংস্থাটি। তাতে দেখা যায়, হাওরে ৪৫ শতাংশ শিশুমৃত্যুর কারণ অপুষ্টি। এ ছাড়া অপুষ্টির কারণে হাওড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৪৬ শতাংশ বয়সের তুলনায় কম উচ্চতার। বন্যার পর হাওরে স্বল্প ওজনের শিশু জন্মহার নিয়ে সংস্থাটির কাছে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে তাদের পর্যবেক্ষণও বলছে, বন্যায় ফসলহানির পর হাওড়াঞ্চলে গর্ভবতী মায়েরা ঠিকমতো প্রোটিন পাননি। সে কারণে সেখানে স্বল্প ওজনের শিশু জন্ম বেড়েছে। ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রোগ্রাম হেড ড. মাহফুজার রহমান বলেন, এবারের বন্যায় ফসলহানির কারণে হাওরাঞ্চলের মানুষের কাছে খাদ্য সহজলভ্য ছিল না। গর্ভবতী মায়েদের জন্য খাদ্যের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় সেখানে স্বল্প ওজনের শিশুর জন্ম জাতীয় পর্যায়ের তুলনায় বেশ বেড়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। পরিস্থিতির উন্নয়নে হাওরের মতো দুর্গম এলাকায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। হাওরের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা ধরনের কাজ চলছে বলে জানান সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাবিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এর পরও যদি পুষ্টিহীনতা ও স্বল্প ওজনের শিশু জন্মের হার বেড়ে যায়, তাহলে কোন এলাকায় বাড়ল, তা জেনে ব্যবস্থা নেয়া হবে। হাওরে কর্মহীনদের সরকার মাসে ৩০ কেজি চাল ও ৫০০ টাকা অর্থসহায়তার পাশাপাশি কৃষি ভর্তুকি দিচ্ছে। তবে কেউ যদি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তথ্য পেলে আমরা তাকে সহায়তা করব। উল্লেখ্য, সুনামগঞ্জ জেলা ইপিআই কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০১৭ সালের মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জেলার হাওরাঞ্চলের ১১টি উপজেলায় বাড়িতে ও হাসপাতালে জন্ম নিয়েছে মোট ৩৬ হাজার ৯৫টি শিশু। বন্যার আগে ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত জন্ম নেয়া শিশুর সংখ্যা ৩৮ হাজার ৪৩৫।