হাজার বছরে বাঙালি প্রথম স্বাধীন হল

সেই সব নানা রঙের দিনগুলি (পর্ব-৬৫)

বাঙালি কী কখনও স্বাধীন ছিল? এ প্রশ্নে নানা বিভ্রান্তি আছে। অনেকে বলেন সিরাজুদ্দৌলার আমলে বাঙালি স্বাধীন ছিল। এর দুটো উত্তর আমি খুঁজে পেয়েছি। ১. মোঘল সাম্রাজ্যের একটি অঙ্গ রাজ্য, প্রদেশ বা সুবা ছিল বাংলা। স্বাধীন ছিল না। ২. সিরাজুদ্দৌলা বাঙালি ছিলেন না। কেউ বলেন, মুর্শিদ কুলি খাঁন বাংলা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ঢাকা থেকে তিনি রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। সে সময় বাংলা স্বাধীন ছিল। প্রথম কথা হল যে, বাংলা স্বাধীন থাকা আর বাঙালি স্বাধীন হওয়া এক কথা না। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে মুর্শিদ কুলি খাঁ আদৌ বাঙালি ছিলেন না। এ সম্পর্কে আগের দুটি পর্বে আমি বিস্তারিতভাবে লিখেছি। ইতিহাস থেকে নির্ভুল তথ্য তুলে ধরেছি। অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিকে বলতে শুনি সেন বংশ যখন বাংলা শাসন করেছিল তখন বাংলা এবং বাঙালি স্বাধীন ছিল। একথাও একেবারেই ভুল। সে কথায় আমি পরে আসছি। তার আগে মুর্শিদ কুলি খাঁ ও সিরাজুদ্দৌলার কুষ্টিনামা আর একবার তুলে ধরতে চাই। কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে সব তরুণ ও নবীন সদস্য আছেন তারা নানা রকমের ইতিহাস বিকৃতির ভিতর দিয়ে এগিয়েছেন। আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৯৫ ছিল সেই ইতিহাস বিকৃতির যুগ। মাত্র ৫ বছরে স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তি সেই মিথ্যার বেসাতি ও অসত্যকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠার গোয়েবেলসীয় তান্ডবের প্রভাব থেকে জাতিকে মুক্ত করতে পারেনি।
ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ সরকার “ মাসির আল উমারা” নামের গ্রন্থে লিখেছেন, মুর্শিদ কুলি খাঁনের পিতৃদত্ত জন্মকালীন নাম ছিল “সূর্য নারায়ণ মিশ্র”। জন্মস্থান দাক্ষিণাত্য। সন খৃ ১৬৭০ । শ্রীমান সূর্য নারায়ণ মিশ্রর বাবা কে ছিলেন সে কথা আমার গবেষণায় উন্মিলিত হয়নি। তবে তার পরিবার যে ছিল খুবই দরিদ্র তাতে কোন সন্দেহ নেই। সম্ভবতঃ একেবারেই রিক্ত নিস্ব এবং ভূমিলগ্ন। আনুমানিক ১০ বছর তখন তার ক্ষুধাতুর বাবা তাকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন আওরঙ্গজেবের রাজস্ব কর্মচারি হাজি শফির কাছে। তার বাড়ি ছিল পারস্যে। তিনি তার ‘খতনা’ করালেন। নাম রাখলেন মোহাম্মেদ হাদী। ১৬৯০ সালে শফি সাহেব রাজ দরবারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে দেশে ফিরে গেলেন। সূর্য নারায়ণ তথা মোহাম্মেদ হাদীকেও সাথে নিয়ে গেলেন। শফি সাহেবের মৃত্যর প্রায় ৫ বছর পর নওমুসলিম হাদী ভারতে ফিরে আসলেন। মোঘল সাম্রাজ্যের একজন দেওয়ান (রাজস্ব কর্মচারি) তাকে চাকুরি দিলেন। তাঁর নাম ছিল আবদুল্লাহ খুরাসানী। তিনি ‘বিদর্ভার (ঠরফধৎনযধ)’ খাজনা তোলার বর্গী সর্দার ছিলেন। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ ছিল সে আমলের দস্তুর। বর্গীরা তখন গরীব প্রজার পেটে লাথি মেরে, বুকে পাড়া দিয়ে, রক্তবমি করিয়ে, ঘরের ঘটি থালাবাটি কেড়ে নিয়ে, ঘরের চাল খুলে নিয়ে খাজনা তুলতো। এমন কি বৌবেটির ইজ্জত কেড়ে হলেও খাজনা আদায় করে প্রভুকে খুশি করতো। প্রজার জিহ্বা টেনে বার করে খাজনা তোলার যোগ্যতা দেখিয়ে সূর্য নারায়ণ ওরেফে মোহাম্মদ হাদী সম্রাট আওরঙ্গজেবের নেক নজরে আসেন। হিন্দু মেরে গরীবের রক্ত চুষে সম্রাট আওরঙ্গজেবের মন গলিয়ে এক সময় তিনি বাংলার সুবেদার হন। সেখান থেকে নবাব। তার সময়ে বাংলা একটি পৃথক করদ রাজ্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। । । মুর্শিদকুলি খান ঢাকা থেকে সুবা বাংলার রাজধানী সরিয়ে নিয়েছিলেন মুর্শিদাবাদে। সেই মুর্শিদাবাদের অদূরে ২১৪ বছর পর মেহেরপুরের বদ্যিনাথ তলায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হল ১০ এপ্রিল ৭১। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন সেটাই যে প্রথম বাঙালি জাতি রাষ্ট্র তথা বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র। তার আগে “বাঙালি কখনও স্বাধীন ছিলনা”, একথা যারা মানতে চান না তারাই সেন রাজার কথা বলে থাকেন। কোন রাজার আমলেই যে প্রজা স্বাধীন থাকে না সে কথাটাও তারা মানতে চায়না। আর সেন বংশের রাজারা যে আদৌ বাঙালি ছিলেন না সেটাও তারা জানেন কিনা সে কথা বলতে পারবো না। যা জানিনা সেটা জানার চেষ্টা করাটা পূন্যের কাজ। কিন্তু কোন কিছু না জানাটা পাপ না। না জেনে, জোর করে কিছু সত্য বলে চালাবার চেষ্টা করাটা অবশ্যই পাপ। সে রকম জ্ঞানপাপীরা আমাদের আশপাশে গিজ গিজ করছে।
সেনদের উত্থান: ছোট করে বলা দরকার যে সেন বংশ একশ বছরের কিঞ্চিত অধিক (আনু. ১০৯৭-১২২৫ খ্রি) সময় বাংলা শাসন করে। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে এগারো শতকের অন্তিমলগ্নে পাল বংশের অবসান ঘটিয়ে সেনদের উত্থান ঘটে। এটি বাংলার ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলায় সেন শাসনের বিশেষ তাৎপর্য এই যে, সেনগণই সর্বপ্রথম সমগ্র বাংলার ওপর তাদের নিরঙ্কুশ শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। তবে তারাও বাঙালি ছিলেন না। সেনদের আদিনিবাস ছিল দাক্ষিণাত্যের কর্ণাট অঞ্চলে (কর্ণাটদেশাতাগত)। আধুনিক মহীশূর, কর্ণাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশের কানাড়ী ভাষাভাষি অঞ্চলকে তাঁদের আদি নিবাস হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তাঁরা ছিলেন ব্রহ্মক্ষত্রিয় অর্থাৎ তাঁরা প্রথমে ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং পরে ব্রাহ্মণ বৃত্তি ত্যাগ করে ক্ষত্রিয় বৃত্তি গ্রহণ করেন। তার পরে সুলতানি আমল, মোঘল আমল গেছে। মুর্শিদ কুলি খানের পর আলীবর্দী খাঁ ও সিরাজুদ্দৌলার আমল গেছে। ব্রিটিশ ১৯০ বছর রাজত্ব করেছে। স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আগে বাঙালির হাতে কখনও দেশ শাসনের ভার আসেনি। ব্রিটিশ চলে যাওয়ার পর পশ্চিম বাংলা ভারতের ফেডারেল সরকারের অধীনে একটি রাজ্যে পরিণত হয়েছে। পূর্ব বঙ্গ ছিল পাকিস্তান ফেডারেল সরকারের অধীন একটি প্রদেশ।
জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক বিপ্লব: জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে সহশ্রাব্দের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুকের রক্তকে কলমের কালি বানিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার মহাকাব্য রচনা করেন। প্রতিবিপ্লব ঠেকাবার শক্তি অর্জন না করে তিনি একটু তাড়াহুড়ো করেই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাটি ছুঁয়েই সমাজতন্ত্র বিনির্মানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ইতিহাস তাঁকে শর্টকাট পথে সে স্বপ্ন পূরণ করার সুযোগ দেয়নি। অতিবিপ্লবী হঠকারিতা ও প্রতিবিপ্লবের তান্ডবে তাঁর স্বপ্ন ছারখার হয়েছে। পরিণামে, ৩০ লাখ শহীদের রক্তে সিক্ত তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশের পতাকাটাকে পুরাণো এবং নতুন শকুনরা একসাথে কামড়ে ধরেছে। এখন আর তাঁর বাঙালিও নেই কবিগুরুর বাঙলিও নেই। সবাই এখন পাসপোর্ট বিবরণে বাংলাদেশী। বাঙালির প্রাণ ভোমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রাষ্ট্রীয় ৪ মূলনীতি- (ক) জাতীয়তাবাদ (খ) ধর্ম নিরপেক্ষতা (গ) গণতন্ত্র (ঘ) সমাজতন্ত্র ঘোষণা করে ১০ জানুয়ারি স্বাধীন স্বদেশে ফিরে বলেছিলেন “আমি বাঙালি। আমি মুসলমান”। আমরা বাঙালি না মুসলমান, তা নিয়ে ১৯৪৭-৪৮ সালে যখন তুমুল বিতর্ক হচ্ছিল তখন জ্ঞানতাপস ইসলামী চিন্তাবীদ ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তার সুরাহা করেছিলেন এই বলে যে, “ আমরা বাংলায় কথাবলি। তাই আমরা আগে বাঙালি’’। ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন আচার ও পোশাক আশাকে আমরা কেউ মুসলমান, কেউ হিন্দু কেউ বৌদ্ধ খ্রিস্টান। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ জাতীয় বিশ্বাস ঘাতকদের চক্রান্তের শিকার হয়ে বঙ্গবন্ধু নিজে সপরিবারে প্রাণ দিলেন কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার মত গণহত্যা ঘটতে দিলেন না। তারপর আমরা “আগে মুসলমান এবং পরে বাংলাদেশী” হয়ে গেলাম কীভাবে সেটা কারও অজানা থাকার কথা না।
বঙ্গবন্ধু বলতেন চীন বিপ্লব থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং রুশ বিপ্লব থেকেও আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক ও মিশরের গামাল আব্দুন নাসেরও আমাদের জন্যে অনেক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। মার্শাল টিটো, ড. সুকর্ণ, ড. আলেন্দের কাছ থেকে এবং প্যাট্রিস লুমুম্বার কাছেও আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।
উনবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকেই চীনে প্রজাতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা হয়। ১৯১২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি চিং সম্রাট তুং রাজ্যত্যাগ করলে ডা, সান ইয়াৎ সেনকে রাষ্ট্রপ্রধান বানিয়ে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিক জন ফেয়ারব্যাঙ্ক লিখেছেন, “চীনের মহান বিপ্লবী নেতা ড: সান ইয়াৎ সেন এর বিশিষ্ট ভূমিকা চীনে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রকাশ্য রাজপথ উন্মুক্ত করে দেয়। ” রাশিয়ার স্বৈরাচরী জারের বিরুদ্ধে দরিদ্র রুশ জনতার অভ্যুত্থান চীনের সশস্ত্র বিপ্লবকে অনুপ্রাণিত করে। ডা. সেন সমাজতন্ত্র বিরোধী ছিলেন না। তবে তিনি বুর্জোয়া বিপ্লব বা জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব শেষ না করে সেই অগ্নিপথে পা রাখেননি।
সান উপলব্ধি করেন যে বিপ্লব করার জন্য যে সব গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে তাদের একত্র করতে না পারলে বিপ্লবের প্রাণশক্তি পাওয়া যাবেনা। বিপ্লব করে চীনকে গড়ে তুলার লক্ষ্যে তিনি সমাজতন্ত্রের কথা না বলে ৩ জাতীয় নীতি ঘোষণা করেন :(ক) জাতীয়তাবাদ (খ) গণতন্ত্র (গ) জনগণের জীবিকা। তিনিই কুমিংটান দল প্রতিষ্ঠা করেণ।
তিনিই চিয়াংকাইশেককে কুমিংটাঙের সামরিক শাখার প্রধান নিযুক্ত করেন। ক্যান্সারে তাঁর অকাল মৃত্যুর পর চিয়াং এর নেতৃত্বে চীনের জাতীয়তাবাদী বিপ্লব সম্পন্ন হয়। মাও জে দং এর নেতৃত্বে চীনা কম্যুসিস্ট পার্টি প্রধান শত্রু চিয়াংকাইশেকের হাত ধরে উভয়ের সাধারণ শত্রু জাপ সাম্রাজ্যবাদকে বিতাড়িত করে। সেটাই ছিল চীনের জাতীয়তাবাদী বিপ্লবের শেষ ধাপ। বুর্জুয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ভিত পোক্ত না হতেই চিয়াং মার্কিন সরকারের সাথে আঁতাত করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঠেকাবার ব্যার্থ চেষ্টা করেন। মাও তাঁর দলের বিপুল বিপ্লবী সামরিক শক্তিকে পূর্ণভাবে কাজে লাগিয়ে এক ঐতিহাসিক বিপ্লবী সংগ্রামের মাধ্যমে চিয়াংয়ের রাজধানী নানজিং দখল করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করেন।
ইন্দোনেশিয়া: পাঠক চলুন এবার আমরা ৫ হাজার দ্বীপ নিয়ে ৩৩ প্রদেশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ৮৭.২৭% মুসলমান অধ্যুষিত ইন্দোনেশিয়ার জটিল বিপ্লবের উপর চোখ রাখি। ৩০০ বছর ওলন্দাজদের দখলে নিষ্পেষিত হয়ে ২০ আগষ্ট ১৯৪৫, ড. সুকর্ণ ও হাতার নেতৃত্বে ইন্দোনেশিয়া স্বাধীনতা অর্জন করে। সুকর্ণ ১২ বছর ওলন্দাজদের কারাগারে বন্দী ছিলেন। তিনিই প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হন। তাঁকে রাষ্ট্র পিতা বা জাতির পিতা মানা হয়। সুকর্ণ সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্যে তাঁর জাতীয় ৫ নীতি -“সুকর্ণ পঞ্চশীলা” ১. ধর্মীয় একত্ববাদ ২.মানবতা ৩. জাতীয ঐক্য ৪. ঐকমত্যভিত্তিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র ৫. সামাজিক ন্যায়বিচার- ঘোষণা করেন। সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি কমরেড আইদিতের নেতৃত্বে কম্যুনিস্ট পার্টি বিকাশের সুযোগ দেন। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে সু সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং জোট নিরপেক্ষ তৃতীয় বিশ্ব গড়ার লক্ষে ১৮- ২৬ এপ্রিল ১৯৫৫ বান্দুং সম্মেলনের আয়োজন করেন। ঔপনিবেশিক শাসন ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা ও ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে ২৯ দেশের প্রতিনিধিগণ এই সম্মেলনে মিলিত হন। সেখান থেকেই জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে।
১ অক্টোবর ১৯৬৫ প্রভাবশালী ৬ জেনারেলকে হত্যা করে কম্যুনিস্টরা রাজধানী জাকার্তা দখল করে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণপন্থী মেজর জেনারেল সুহার্তো পাল্টা ক্যূ করে সুকর্ণকে বন্দী করেন। কম্যুনিস্ট পার্টি প্রধান কমরেড আইদিতসহ, প্রাথমিক হিসাবে ৫ লক্ষ, পরবর্তী হিসাবে ১০ লক্ষ এবং সর্ব শেষ জরিপে ২০ লক্ষ বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক নিহত হন। সি আই এ হালে দাবি করেছে যে ইন্দোনেশিয়ায় কম্যুনিস্ট নির্মূল করতে যে পরিমাণ লোকক্ষয় হয়েছে তা প্রায় রাশিয়ার বিপ্লবোত্তর লোকক্ষয় এবং জার্মানির হলোকাষ্টের সমান। আমরা জার্মানির অঙ্কটা জানি। সেটা ৬ মিলিয়ন বা ৬০ লক্ষ। সোভিয়েত রাশিয়া তাদের বিপ্লবোত্তর লোকক্ষয়ের ব্যাপারে কোন তথ্য কোনদিন প্রকাশ করেনি।
বঙ্গবন্ধু বলতেন চীন বিপ্লব থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং রুশ বিপ্লব থেকেও আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক ও মিশরের গামাল আব্দুন নাসেরও আমাদের জন্যে অনেক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। মার্শাল টিটো, ড. সুকর্ণ, ডা. আলেন্দের কাছ থেকে এবং প্যাট্রিস লুমুম্বার কাছেও আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই আমাদের নিজের পথের দিশা খুঁজে নিতে হবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই বঙ্গবন্ধু শত্রুমিত্র চিহ্নিত করেছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজুদ্দিনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন একটা পূর্ণাঙ্গ রোড ম্যাপ। ক্যাপটেন মনসুর আলী কামরুজ্জামানকেও আস্থায় নিয়েছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে তাঁর আনুকূল্যে প্রবাসী সরকার গঠন, মওলানা ভাসানী, মনিসিং, মনোরঞ্জন ধর, অধ্যাপক মুজাফ্ফর আহমদ প্রমুখকে নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন, মুক্তিবাহিনী গঠন ও তাদের ট্রেনিং ইত্যাদি সব বিষয়ই ছিল সেই নকশায়। এমনকি মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতির নামও তিনি চূড়ান্ত করে গিয়েছিলেন। সশস্ত্র সংগ্রাম তথা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালির জাতীয়তাবাদী বিপ্লব তাঁর নির্দেশিত পথেই সমপন্ন হয়েছিল।
জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব: দেশে ফিরে জাতির জনক জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেন। কালক্ষেপন না করে ৭২ শেষ না হতেই ৫৪ সালের ব্যালট বিপ্লবের ২১ দফা, ১৯৭০ সালে গণ ম্যান্ডেট পাওয়া ৬ দফা-১১ দফা এবং ১০ জানুয়ারি ঘোষিত তাঁর ৪- দফা রাষ্ট্রীয় মূল নীতির ভিত্তিতে, ৬ ডিসেম্বর ১৯৭০ নির্বাচিত সাংসদ ও বিধায়কদের নিয়ে গঠিত গণপরিষদের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংবিধান প্রণয়ন করেণ। ৭২ এর সংবিধানের ভিত্তিতে ৭ মার্চ ১৯৭৩ প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রসহ ৪ মূলনীতি গণম্যান্ডেট প্রাপ্ত হয়। কিন্তু সময়টা ছিল খারাপ। স্নায়ুযুদ্ধের একটা উত্তপ্ত প্রহর। সমাজতন্ত্র একটা নিষিদ্ধ দর্শন। চীনে জেনারেল চিয়াংকাইশেকের হাত ধরে প্রতিবিপ্লবী শক্তি যেভাবে বিপ্লবের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিল; ইন্দোনেশিয়ায় জেনারেল সুহার্তোর হাত ধরে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবকে ধ্বংস করেছিল ; ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩, চিলিতে জেনারেল আগুস্তো পিনোশের হাত ধরে প্রতিবিপ্লব যেভাবেই উদ্ধত ও দুর্বিনীত হয়ে ডা. সালভেদর আলেন্দেকে হত্যা করেছিল ; বাংলাদেশেও তেমনি জাতীয় বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মুশতাক ও জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাত ধরে সুপরিকল্পিত, সুসংগঠিত প্রতিবিপ্লবী শক্তি কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ১৫ আগস্ট প্রথম প্রহরে রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা হরণ করলো। বঙ্গবন্ধু তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারলেন না।
বঙ্গবন্ধুর পন্থায় কোন ভুল ছিলনা। কিন্তু জাতির জনক বিপ্লবী সরকার গঠন করে স্বাধীনতা বিরোধীদের বুলডোজার দিয়ে পিশে ফেলতে দিলেন না। কাদের সিদ্দিকী পল্টন ময়দানে বেয়নেট চার্জ করে কয়েকজন কোলাবরেটরকে মারলো দেখে তাকে ভর্ৎসনা করলেন। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র হতে দিলেন না। মুজিব বাহিনীর হাতে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণভার তুলে দিলেন না। নক্শাল নিধনের মত মাওবাদীদের পিশে ফেলতে দিলেন না। হক তোহা মতিন বেঁচে রইলো। মনিসিং মুজাফ্ফর আহমদকে মন্ত্রী বানালেননা। ইত্যাদি প্রভৃতি বহু কারণে তাঁর দলে ও বেদলে ক্ষোভ সৃষ্টি হতে লাগলো। রিলিফ চুরি, কম্বল চুরিরজন্য বড় হাঙ্গর ধরে ফেললেন। চাটার দলের কথাবলে তিরস্কার করলেন। লাল ঘোড়া দাবড়ে দেয়ার হুমকি দিলেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। বললেন, আইন দিয়ে হবে না। গণআন্দেলন করে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করতে হবে। আর সেই কবে ১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে রাজশাহী জেলে গুলিতে তেভাগা আন্দোলনের ৮ নেতা নিহত হয়েছিল। তিনি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে কথা দিয়েছিলেন যে ক্ষমতায় গেলে কৃষকের তেভাগা দাবি পূরণ করবেন। সেই কথা রাখতে বঙ্গবন্ধু সমবায় করে কৃষকের তেভাগা দাবি পূরণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন। শেষের এই দুটো এজেন্ডা তিনি বাস্তবায়ন করার সময় পেলেন না।
বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল ১. তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধ্বজাধারী ২. ভারত রাশিয়া বিরোধী বাম হঠকারী ৩.ক্ষমতার জন্যে উদগ্রীব বাম গোষ্ঠী। চাপের মুখে সিপিবি ও ন্যাপের সাথে নির্বাচনের পরেই তিন দলীয় জোট গঠন করাটাই হয়ত কাল হয়েছিল। দলের ভিতরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও চাপা ক্ষোভ খন্দকার মুশতাকের সহায় হয়েছিল। চিয়াং কাইশেক, সুহার্তো ও পিনোশের সগোত্রীয় সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল জিয়া মুশতাককে সামনে রেখে মুক্তিযোদ্ধার মুখোশ পরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পিঠে ছুকিাঘাত করলো। আইয়ুব, ইয়াহিয়া, টিক্কা, হামিদ নিয়াজী, গোলাম আজম সম্মিলিতভাবে যা করতে পারেনি জিয়া একাই সেটা করে দেখালেন।
উত্তরসূরীর উপর দায়িত্ব: ১৯৮১ থেকে ধরলে ২৯ বছর। ৮১ সালে আওয়ামি লীগের সভাপতি পদে অভিষেকের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু কন্যার আবির্ভাব আর ৩০ মে ১৯৮১ জিয়া বধের তারিখের মধ্যে খুব বেশি দিনের ব্যবধান ছিল না। “তোমারে বধিবে যে গোকূলে বাড়িছে সে”। কে মারলো সেটা বড় কথা হয়নি। তার যাওয়াটা দরকার ছিল। তাই সেটাই বড় হয়ে উঠেছিল। তার মৃত্যু না হলে বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না। কিন্তু তিনি দুবার ক্ষমতায় বসেও কে তার স্বামীর হত্যাকারী? সেটা জানারই চেষ্টা করেননি। পিতা হত্যার হুকুমের আসামীকে জুলফিকার আরী ভূট্টোর মত ফাসিতে ঝুলানোর কষ্ট করতে হয়নি শেখ হাসিনাকে। জিয়া হত্যাকারী সাব্যস্ত করে জেনারেল মঞ্জুরকে খুন করে বা করিয়ে হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ ফেঁসে গেলেন। কিন্তু শেখ হাসিনার দয়ায় ফাঁসিতে না ঝুলে লাইফ সাপোর্টে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। একেই বলে কপাল। শত্রুর শত্রু বলে কথা। ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীকে গুলি করে হত্যা করে, স্বয়ং শেখ হাসিনার মিছিলে গুলি করে গণহত্যা করে, ছাত্র মিছিলে ট্রাক চাপা দিয়ে দেলোয়ার -সেলিমের মাথা পিশে ফেলেও কিছু হলনা। যে যাই বলুক, তার মত বড় দুর্নীতিবাজ, লম্পট, টাকা পাচারকারি, ধোকাবাজ এখনও ধরা পড়েনি একটাও। তারই প্রতিক্রিয়ায় কিনা জানিনা দেশে হালে দূর্নীতির গল্পটাই ‘টক অফদি কান্ট্রি’ হয়ে পড়েছে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত এজেন্ডা মনে করেই দূর্নীতির দানবটাকে এবার ফাঁসি না দিয়ে কোন উপায থাকছে না। দেশ ব্যাপী দূনীতির কত কেচ্ছা কাহিনী- এ কান্ড, সে কান্ড, কত কান্ড। সবচেয়ে বড় কান্ড দলের ভিতর দূর্নীতির ক্যানসার। ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেহে। বড় বড় টিউমারগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে। দেশের অনেক উন্নতি হয়েছে। হচ্ছে এবং আরও হবে। শর্ষের ভিতর ভূত থাকলে সে ভূত কোন ওঝাই তাড়াতে পারেনা। সব মন্দেরই একটা ভালো আছে। লাসভেগাস দেখতে আসে হাজার হাজার দর্শক। সেটা একটা বড় পর্যটন শহর। কোটি কোটি ডলার আয়। আমি যেখানে কপালগুণে বসবাস করছি। পুঁজিবাদী স্বর্গে সমাজতান্ত্রিক সেবা পরিসেবার ফায়দা উপভোগ করছি, সেখান থেকে ওড়া পথে মাত্র একঘন্টার পথ। কিন্তু যাওয়া হয়নি। সেখানে আছে দেখার মত জিনিস শুধু ক্যাসিনো। কারও কপাল পোড়ে কারও কপাল খোলে। সে সবেও আমার কোন আগ্রহ নেই। তবে আমার মনে হয় এবারে বাংলাদেশের কপাল খুলবে। ঘুষ দূর্নীতি মদগাঁজা সবই হারাম। কিন্তু সবচেয়ে বড় হারাম জুয়া। দেশের বড় বড় ঘুষখোর বড় বড় পীর মোশায়েখের মুরিদ। দোয়ার বরকতে তারা পগার পার থাকেন। কিন্তু আমার বিশ্বাস শফি হুজুর, চরমোনাই হুজুর, শর্ষিণা হুজুরসহ সব বুজুর্গ, সব আল্লামা মশায়েখ, সব হুজুরই জুয়ার বিরুদ্ধে বিবি তালাকের ফতোয়া দিয়ে দ্বীনি দায়িত্ব পালন করতে চাইবেন। আর সেই সুযোগে যদি আমাদের এলিট ফোর্সগুলো জঙ্গী দমনের জজবা নিয়ে ক্যসিনো ও চাঁদবাজির বিরুদ্ধে অপারেশন ক্রসফায়ার চালিযে যান তাহলে জাতির মনে স্বস্তি আসবে। মুশকিল অহসান হবে।
২৯ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ জননন্দিত জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন বিশ্বে নারী নেতৃত্বের শীর্ষে। এটাও বাংলাদেশের জন্যে একটা মস্তবড় সৌভাগ্য। তিনি কসম কেটেছেন, যে ভাবে জ্ঙ্গী দমন হয়েছে ঠিক সেই ভাবে, সেই শক্তি, সেই কৌশল, সেই অস্ত্র, সেই অব্যর্থ মন্ত্র দিয়েই ঘুষ দুর্নীতি, মদজুয়া চাঁদাবাজি, মাস্তানি নির্মূল করবেন। তাঁর কল্যান মন্ত্রে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ২৩% নেমে এসেছে। ২০৩০ নাগাদ ০৩ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। উন্নয়নশীল বিশ্বে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই পেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকীতে তিনি পিতার অসামাপ্ত কাজ শেষ করতে প্রাণপণ চেষ্টা করবেন বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। আমি তাঁর সাফল্য কামনা করছি।
ক্যালিফোর্নিয়া।
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯