হারকিউলিস রহস্যে নতুন মোড়: পালিয়ে বেড়াচ্ছে ধর্ষিত ছাত্রীর পরিবার

ঝালকাঠি : ঘটনার পরম্পরায় রহস্যের জাল আরও বড় হচ্ছে। পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলায় মাদ্রাসাছাত্রী ধর্ষণকাণ্ডের পর ঘটে চলেছে একের পর এক নাটকীয়তা। পালিয়ে যাওয়ার পর ধর্ষণ মামলার দুই আসামির নিখোঁজ হওয়া, তাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ, পরে গলায় চিরকুট লেখা দুজনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার এবং চিরকুটে সাবধানী বার্তা দেওয়া নেপথ্যের লোক হিসেবে হারকিউলিস নামটি ব্যবহার করা নিয়ে নতুন মাত্রার উদ্বেগ-উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কে বা কারা এই হারকিউলিস তা নিয়ে পুলিশ এখনও অন্ধকারে। এরই মধ্যে হারকিউলিস রহস্যে নতুন মোড় নিয়েছে। ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রীর পরিবার বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কেন পরিষ্কার করে কেউ কিছু জানে না, এমনকি পুলিশও না। ওই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও সম্ভব হচ্ছে না। ধর্ষণ মামলার ২ নম্বর আসামি নিহত সজল জমাদ্দারের বাবা শাহ আলম জমাদ্দার বাদী হয়ে তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে গত ২৯ জানুয়ারি ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া থানায় মামলা করেন। এতে আসামি করা হয়েছে পাশবিক নির্যাতনের শিকার মাদ্রাসাছাত্রীর বাবাসহ নয়জনকে। এ জন্য ওই ছাত্রীর পরিবার বাড়ি ছেড়েছে বলে এলাকাবাসী মনে করছে।

গত ২ ফেব্রæয়ারি মাদ্রাসাছাত্রীর বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেশীরা জানান, ২৬ জানুয়ারি প্রথম লাশ উদ্ধারের পর থেকে তাদের কাউকে আর বাড়িতে দেখা যায়নি। তারা কোথায় গেছে, তাদের সঙ্গে অন্য কিছু হয়েছে কি না, তা কেউ জানে না। এ ঘটনায় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

গত ১ ফেব্রæয়ারি ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার আঙ্গারিয়া থেকে রাকিব মোল্লার এবং ২৬ জানুয়ারি কাঁঠালিয়ার বীণাপাণি থেকে সজল জমাদ্দারের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সজলের মরদেহ পাওয়ার পর মামলা হলেও রাকিবের বেলায় গত ৩ ফেব্রæয়ারি পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। রাকিবের বাবা কালাম মোল্লা জানান, তার ছেলেনির্বাচনের সময় বাড়িতে এসেছিল। তারপর তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা হলে সে ঢাকায় চলে যায়। ঢাকা থেকে গত ২৫ জানুয়ারি দুটি মাইক্রোবাসে আসা লোকজন রাকিবকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে সে নিখোঁজ ছিল। রাকিবের বাবা আরও জানান, ধর্ষণের মেডিকেল রিপোর্ট এখনও আসেনি। আদৌ ধর্ষণ হয়েছে কি না, তাও প্রমাণিত হয়নি। যদি আইনে দোষী হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী বিচার হবে। কিন্তু এভাবে হত্যা করা হবেÑ এটা মেনে নেওয়া যায় না। তার দাবি, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাÐের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন তিনি।

পুলিশ, নিহত ব্যক্তির পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, গত ১৪ জানুয়ারি  বেলা ১১টায় ওই মাদ্রাসাছাত্রী বাড়ি থেকে তার নানাবাড়ি যাচ্ছিল। উপজেলার নদমুলা গ্রামের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় রাকিব মোল্লা ও সজল জমাদ্দার মেয়েটির মুখ চেপে ধরে জোর করে পাশের একটি পানের বরজে নিয়ে যায়। এরপর তারা পালাক্রমে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। রাকিব মেয়েটিকে ধর্ষণ করার সময় সজল ভিডিও করে।

এ ঘটনায় ১৭ জানুয়ারি ভাÐারিয়া থানায় উপজেলার ভিটাবাড়িয়া গ্রামের কালাম মোল্লার ছেলে রাকিব (২০) ও নদমুলা গ্রামের শাহ আলম জমাদ্দারের ছেলে সজলের (২৮) বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন ওই ছাত্রীর বাবা। এরপর রাকিব ও সজল ঢাকায় চয়ে যায়। পরে ঢাকা থেকে ২৪ জানুয়ারি সজল ও ২৫ জানুয়ারি রাকিব নিখোঁজ হয়।

গত ২৬ জানুয়ারি ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার বীণাপাণি গ্রামের একটি মাঠ থেকে চিরকুটসহ সজলের ও ১ ফেব্রæয়ারি রাজাপুর উপজেলার আঙ্গারিয়া গ্রামের পরিত্যক্ত একটি ইটভাটার পাশ থেকে রাকিবের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। রাকিবের লাশের বুকে একটি কাগজে লেখা ছিল, আমি পিরোজপুরের ভাÐারিয়ার (অমুকের) ধর্ষক রাকিব। ধর্ষণের পরিণতি ইহাই। ধর্ষকরা সাবধানÑ হারকিউলিস।

একইভাবে সজলের গলায় সুতায় বাঁধা চিরকুট ঝোলানো ছিল। সজল একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি একটি কোম্পানিতে চাকরি করত। তার লাশ উদ্ধারের পর মামলা হলেও এ হত্যাকাÐের কোনো ক্লু বের করতে পারেনি পুলিশ।

ঝালকাঠির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া সার্কেল) মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন জানান, সজল হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। রাকিব হত্যার ঘটনায় তার পরিবার মামলা করেনি। মামলা দিলে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, দুটি হত্যাকাÐে উঠে আসা হারকিউলিস নামের নেপথ্যে কে বা কারা রয়েছে, তা বের করতে নিবিড় তদন্ত চালানো হচ্ছে। শিগগিরই এর ক্লু উদ্ঘাটন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।