হারকিউলিস সাজার রাজনীতি

সুমন পালিত
২০১৮ সালকে বাংলাদেশের মানুষ স্বাগত জানাচ্ছে নির্বাচনের বছর হিসেবে। নির্বাচন ও গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে চার বছর ধরে দেশে যে সংকট বিরাজ করছে তা এ বছর কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে এই আশা নিয়ে।
সন্দেহ নেই, আমাদের রাজনীতির সব পক্ষই গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। নিজেদের পরমতসহিষ্ণু ভাবতেও তাদের জুড়ি নেই। তারপরও তারা হারকিউলিসসুলভ মনোভাব থেকে কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারছেন না। দেশের গত ৪৬ বছরের সব বিপর্যয়ের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে নেতা-নেত্রীদের দাম্ভিক মনোভাব। তাই পাঠকদের নিয়ে যেতে চাই গ্রিক পুরাণের একটি সুবিখ্যাত কাহিনীর দিকে।
একদিন মহাবীর হারকিউলিস দুই পাহাড়ের মধ্য দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। সেই সংকীর্ণ পথে হঠাৎ তিনি একটি লাল টুকটুকে আপেল পড়ে থাকতে দেখলেন। খেয়ালবশেই হারকিউলিস পা দিয়ে আপেলটি পিষে ফেলতে চাইলেন। কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার আপেলটি মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার বদলে দ্বিগুণ আকার ধারণ করল।
তা দেখে খেপে গেলেন মহাশক্তিধর হারকিউলিস। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে দ্বিগুণ বেড়ে ওঠা আপেলটিকে গদা দিয়ে আঘাত করলেন। কিন্তু আপেলটি থেঁতলে যাওয়ার বদলে হারকিউলিসকে পরিহাস করে আরও বড় আকার ধারণ করল। দাম্ভিক গ্রিকবীর এতে আরও বেপরোয়া হলেন। গোয়ার্তুমিতে পেয়ে বসল তাকে। তিনি একের পর এক আঘাত হানতে লাগলেন আপেলটির ওপর। কিন্তু বৃথাই আঘাত হানা। প্রতি আঘাতেই তার আকার বেড়ে চলল। একপর্যায়ে আপেলটি পর্বত সমান আকার ধারণ করে হারকিউলিসের পথ বন্ধ করে দিল। সামনে এগোনোর পথ তার রুদ্ধ। এখন পেছনে হটা ছাড়া উপায় নেই।
একটা তুচ্ছ আপেলের কাছে হেরে গিয়ে হারকিউলিস স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। বলা যায়, কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা তার। এ সময় তার সামনে উদয় হলেন স্বর্গীয় দেবী এথেনা। হতবিহ্বল হারকিউলিসের ধড়ে যেন প্রাণ এলো। তিনি মিনতির দৃষ্টিতে তাকালেন দেবীর দিকে। এথেনা বললেন, বৎস, তুমি অযথা ওই ক্ষুদ্র আপেলটিকে আঘাত করলে কেন? এর নামই হলো বিবাদ। তুমি যতই বিবাদে লিপ্ত হবে ততই তা বৃদ্ধি পাবে। এই বিবাদ-বিসংবাদ এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যেই সত্যিকারের কল্যাণ।
হারকিউলিসকে নিয়ে গ্রিক উপাখ্যানে অনেক কাহিনী রয়েছে। তার সবকটিই যেমন শিক্ষণীয়, তেমনি বৈচিত্র্যময়। দেশের রাজনৈতিক হাল-হকিকত দেখে কেন যেন হঠাৎ গ্রিক উপকথার কাহিনীটি মনে পড়ে গেল। আমাদের দেশে গণতন্ত্র হাঁটি হাঁটি পা পা করে একাধিকবার যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু কখনই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। মাঝপথে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়েছে। আমরা গণতন্ত্রবাদী বলে নিজেদের দাবি করলেও গণতন্ত্রচর্চায় পারঙ্গম নই। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা বা ইনস্টিটিউশনে পরিণত করার ক্ষেত্রেও রয়েছে আগ্রহের ঘাটতি। গণতন্ত্রের জন্য আমাদের লড়াকু ভূমিকায় ঘাটতি না থাকলেও গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার অভাব রয়েছে। গণতন্ত্র সম্পর্কে বলা হয়, তোমার নাকের যেখানে শুরু, সেখানে আমার হাত ছোড়ার অধিকারের সমাপ্তি। অর্থাৎ রাস্তা দিয়ে হাত দুলিয়ে চলার অধিকার সবার আছে। কিন্তু এ অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে কারও নাকে যাতে আঘাত না লাগে সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, আমরা হাত ছোড়ার অধিকার ভোগ করতে যতটা আগ্রহী, অপরের নাক বাঁচাতে ততটা মনোযোগী নই। এই হীনমন্যতা গণতন্ত্রচর্চায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনা কখনো কখনো আমাদের উপরিকাঠামোতে প্রভাব বিস্তার করলেও মননে-মজ্জায় স্থান পায়নি।
এই স্থান না পাওয়া অর্থাৎ গণতন্ত্রকে সঠিকভাবে আত্মস্থ না করার ব্যর্থতায় বারবার বিপর্যয় নেমে এসেছে। এ দেশের ইতিহাসের অনেক কৃতী পুরুষ জীবন হারিয়েছেন সে বিবাদের পরিণামে। তবু আমাদের শিক্ষা হয়নি। ‘গণতন্ত্রের’ প্রতি কমিটমেন্টের অভাব না থাকলেও তা অনুশীলনে রয়েছে নিদারুণ ঘাটতি। আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের কথাবার্তায় এ ঘাটতির প্রতিফলন স্পষ্ট। বিশেষ করে পরমতসহিষ্ণুতার প্রতি আমাদের অনীহা যেন ক্রমশই বাড়ছে। সবার বক্তব্যে প্রতিফলিত হচ্ছে ‘দেখিয়ে দেওয়ার’ বা খতম করার অবাঞ্ছিত সংলাপ। কারণে-অকারণে প্রতিপক্ষের দেশপ্রেম নিয়ে খোঁটা দেওয়া আমাদের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের নেতারা বুঝতে চান না তাদের এসব বক্তব্য কতটা দায়িত্বহীনতার পরিচয় বহন করছে। তারা বুঝতে চান না রাজনীতিতে ব্যক্তি আক্রোশ ও বিদ্বেষের কোনো স্থান নেই। বিশেষত গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তার প্রশ্নই ওঠে না। ব্যক্তিবিদ্বেষ ও বিবাদ-বিসংবাদের পরিণতিতেই এ দেশে ‘গণতন্ত্র’ একটি বিমূর্ত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য ও পরমতসহিষ্ণুতা। নিজের অধিকারের পাশাপাশি অপরের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা। কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে তা অনুপস্থিত বলেই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ¦ প্রায়শই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সরকারি শিবিরের সঙ্গে বিরোধী শিবিরের অবস্থান দূরতিক্রম্য হয়ে পড়ে। মেধা ও মননশীলতার বদলে ঘৃণা ও গোঁয়ার্তুমি রাজনীতির নিয়ামক শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ দুর্বলতার সুযোগেই রাতের আঁধারে সন্তর্পণে এগিয়ে আসে ষড়যন্ত্রকারীরা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার টুঁটি চেপে ধরে নির্বিবাদে। যেমনটি ঘটেছে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে-তে, ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চে। সর্বশেষ ২০০৭-এর ওয়ান-ইলেভেনে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দল একই মুদ্রার দুই পিঠ। বিরোধী দলের সহযোগিতা ছাড়া কোনো সরকারের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে দেশ চালানো সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিরোধী দলের ভূমিকা ‘ওয়াচ ডগ’-এর মতো। সরকার সততার সঙ্গে কাজ করবে কিনা তার নিশ্চয়তা বিধান করে বিরোধী দলের এই ভূমিকা। সংসদে বিরোধী দলের তীব্র বাক্যবাণ সরকারি দলের কাছে কখনো কখনো অসহ্য মন হতে পারে, কিন্তু বিরোধী দল থাকলেই কেবল সংসদের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ে। বিরোধী দলহীন সংসদ সাধারণ মানুষ দূরের কথা, সরকার সমর্থকদের মনোযোগ আকর্ষণেও ব্যর্থ হয়। আমাদের দেশে যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, বিরোধী দলের মধ্যে ষড়যন্ত্র খোঁজাই তাদের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে ঠিক এর বিপরীত চিত্রই দেখা যায়। বঙ্গবন্ধুর আমলেও আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকেই বিরোধী দলকেই যত নষ্টের মূল বলে ভাবতেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যে মর্মান্তিক ঘটনায় বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন, তার সঙ্গে বিরোধী দলের সম্পর্ক ছিল না। সেখানে ঘরশত্রু বিভীষণদের ভূমিকাই ছিল প্রবল।
১৯৮১ সালের ৩০ মে নিহত হন প্রেসিডেন্ট জিয়া। এ হত্যাকা-ে কোনো বিরোধী দলের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। অতি কাছের লোকদের ষড়যন্ত্রেই প্রাণ হারান মুক্তিযুদ্ধের এই বীরসেনানী। বিচারপতি সাত্তারের সরকার উত্খাতেও কোনো বিরোধী দলের ভূমিকা ছিল না। প্রেসিডেন্ট জিয়ার নৃশংস হত্যাকা-ের পর যে এরশাদ বিচারপতি সাত্তার সরকারের ‘অভিভাবক’ সেজে নেপথ্যে কলকাঠি ঘুরিয়েছেন তার দিকে এখনো বিএনপির নেতা-কর্মীরা নিক্ষেপ করেন সন্দেহের তীর।
আমাদের দেশে যারা সরকারে থাকেন তারা প্রায়ই ভিন্নমত ও রাষ্ট্রদ্রোহিতা এ দুটি বিষয় গুলিয়ে ফেলেন। ভিন্নমত প্রকাশ করলেই তার মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহিতা খোঁজার প্রবণতা চলে আসছে সেই পাকিস্তান আমল থেকেই। এ প্রবণতা সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বার বার আস্থার সংকট সৃষ্টি করছে। ’৯১-এর পর সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও কোনো সরকারই বিরোধী দলকে আস্থায় নেওয়ার গরজ অনুভব করেনি।
১৯৭৫, ১৯৮১, ১৯৮২ এবং সব শেষে ওয়ান-ইলেভেনের বিপর্যয় সত্তে¦ও রাজনীতিকদের কেউ শিক্ষা নেননি। বলা হয়, ইতিহাসের শিক্ষা হলো ‘ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। এ শিক্ষা না নেওয়ার কারণেই দেশের রাজনীতিতে বিবাদ-বিসংবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আজ যে দূরত্ব গড়ে উঠেছে, তার জন্য কারা দায়ী তা আমাদের বিচার্য নয়। এ বিবাদ-বিসংবাদ জাতির অগ্রযাত্রাকে কণ্টকিত করছে। দেশের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলছে। গণতন্ত্রের ভবিষ্যেক প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
দেশে গণতন্ত্র চর্চায় সরকার ও বিরোধী দল দুই পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে। তবে যারা ক্ষমতায় আছেন এক্ষেত্রে তাদের দায়ই বেশি। তারা যদি হারকিউলিসসুলভ মনোভাবে ভোগেন তবে সংকট অনিবার্য হয়ে উঠবে। নিজেদের জন্যও তা সুখকর হবে না। আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে উদার হতে হবে। হরকিউলিসসুলভ মনোভাবের অবসান ঘটিয়ে যেতে হবে সমঝোতার পথে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।