হাসিনা শাপ মারলেন লাঠিও ভাঙ্গলেন না

নিউইয়র্কঃ নিউইয়র্কে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি-ঠিকানা।

ঠিকানা রিপোর্ট: জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন এবং গণসংবর্ধনা শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্ক ত্যাগ করেছেন গত ২৯ সেপ্টেম্বর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ- উদ্দীপনা এবং অনেক আশা আকাঙ্খার জন্ম নেয়। গত দুই বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা স্বপ্ন দেখতে থাকেন প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক এসে কমিটি দেবেন। ২০১৮ সালে কমিটির দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনা সভায় তাঁর উপস্থিতিতেই স্লোগান দেয়া হলো ‘নো মোর সিদ্দিকী’। এই স্লোগানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিব্রতবোধ করেছিলেন। ধমক দিয়েই তিনি স্লোগান থামিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী কমিটি না দিয়েই চলে যান। যাবার সময় বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমানকে বলেছি সম্মেলন করার প্রস্তুতি নেয়ার এবং সবাইকে নিয়ে কাজ করার জন্য। ড. সিদ্দিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর আস্থা পূরণে চেষ্টাও করেছিলেন। দলে নতুন করে অনেককে কো-অপ করলেন। তা নিয়েও বিতর্কের জন্ম হয়। ডা. সিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বেই যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ কর্মকান্ড চালাতে থাকে। কমিটি না দেয়ায় বিভক্ত গ্রæপের খুব একটা কর্মকান্ড ছিলো না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার জাতিসংঘে আসার কয়েক মাস আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা এবং বিভক্তি দেখা দেয়। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা এখন বলতে গেলে অধিকাংশ সময়েই বাংলাদেশে থাকেন। সূত্র মতে তারা ছোট বড় বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে জড়িত। সেই সব নেতাদের সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সিদ্দিকুর রহমান বিরোধী বা কমিটি প্রত্যাশিরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য নেতাদের সাথে স্বাক্ষত করেছিলেন। সেই সব সাক্ষাতের কথা এবং নতুন কমিটির কথা তারাও বিভিন্ন সভা- সমাবেশে বলেছিলেনও।

নিউইয়র্কঃ যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ। ছবি-ঠিকানা।

গত বছরের তুলনায় এবার কমিটি নিয়ে উত্তেজনা ছিলো অনেক বেশি। অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন গত বছর নো মোর সিদ্দিক স্লোগান দেয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রী হয়ত কমিটি দেবেন। প্রচন্ড বিরোধিতার মুখেও ড. সিদ্দিকুর রহমান তার কাজে অটল ছিলেন। রাত দিন গণসংযোগ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনার স্থান চ‚ড়ান্ত করেছিলেন। যারা বিরোধিতা করেছেন তারা কোন হল ঠিক করেননি। উল্টো ঘোষণা দিয়েছিলেন ড. সিদ্দিকুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রীর গণসংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করতে দেয়া হবে না। যিনি হল ঠিক করলেন, সব কিছু প্রস্তুত করলেন তাকেই সভাপতিত্ব করতে দেয়া হবে না বলে তারা সেটা বাস্তবায়নও করেছিলেন। বিভিন্ন সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ এই বিরোধের সুযোগ নেন আমেরিকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই কুটনীতিক। তাদের চালে ধরাশায়ী হন ড. সিদ্দিকুর রহমান। তিনি তার কমিটির লোকজন নিয়ে অসহায়ের মত বসেছিলেন সংবর্ধনা সভায় দর্শকের আসনে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের মধ্যে চরম ক্ষোভ রয়েছে। তারা বলেছেন, কার লাভ হলো? ক্ষতিতো হলো যারা যুক্তরাষ্ট্রে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন তাদের। সারা বছর বৃষ্টি- বাদল, তুষার এবং প্রচন্ড ঠান্ডাকে উপেক্ষা করে সরকারের পক্ষে সভা- সমাবেশ এবং বিক্ষোভ করেন। নিজের অর্থ খরচ করে ছুটে যান লবিং করতে ওয়াশিংটনে। প্রাপ্তি বলতে তাদের একটাই আর সেটি হলে প্রধানমন্ত্রী এলে তাকে সম্মান জানানো এবং তার সাথে মঞ্চে একটু বসা। গুতোগুতিতে লাভ হয়েছে কুটনীতিকের, ক্ষতি হলো যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের। তারা বলেন, এমন দাবার গুটি এবার চালানো হয়েছে যে নেত্রী ২২ সেপ্টেম্বর আসলেও কারো সাথে তেমন বৈঠক হয়নি। সবার প্রত্যশা ছিলো ২২ সেপ্টেম্বর নেত্রী আসবেন, ২৮ সেপ্টেম্বর সংবর্ধনার আগে বিভিক্ত গ্রæপের সাথে বৈঠক করবেন। তারা বলেন, নেত্রী ডেকে নিয়ে একটি কথা বললে সবাই শুনতো। অনুষ্ঠানে গন্ডগোল বা স্লোগান তো দূরের কথা। তারা বলেন, শেখ হাসিনার কথার বিরোধিতা করার মত কারো সাহস বাংলাদেশেও নেই, প্রবাসেতো দূরের কথা। কিন্তু সেই সুযোগে ট্রাম্প করেছেন অন্যরা। পরাজিত হলো রাজনীতি। তারা আরো বলেন, আজকে ড. সিদ্দিকুর রহমানের বিরোধিতা করে তার সভাপতিত্বে করতে দেয়া হলো না। আগামীতেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। যারা সিদ্দিকুর রহমানের বিরোধিতা করেছেন আগামীতে তারা দায়িত্ব পেলে তাদের বিরোধিতা করা হবে এবং তারাও সভাপতিত্ব করতে পারবেন না। ফলে কার লাভ আর কার ক্ষতি? তারা ক্ষোভের সাথে বলেন, ড. সিদ্দিকুর রহমানই হল ভাড়া প্রায় ১ লাখ ডলার দিয়েছেন। অন্য কেউতো দেননি। প্রথম হল ভাড়ার জন্য ডা. ফেরদৌস খন্দকার দিয়েছিলেন ৫ হাজার ডলার, সোনালী এক্সচেঞ্জ দিয়েছিলো ৫ হাজার ডলার। কিন্তু সেই অর্থ তারা প্রথম হলের জন্য দিয়েছিলেন। সেই অর্থও সিদ্দিকুর রহমান নিজ হাতে নেননি। ড. সিদ্দিকুর রহমান একই দ্বিতীয় হল ভাড়া দিয়েছেন। কারো কাছ থেকে একটি পয়সাও নেননি। ড. সিদ্দিকের অর্থে অন্যরা সভা করে চলে গেলেন। তারা আরো বলেন, ড. সিদ্দিকুর রহমান সভাপতিত্ব করলে কমপক্ষে শতাধিক লোকতো মঞ্চে বসার সুযোগ পেতেন, অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের বক্তব্য না হোক প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দেয়ার সুযোগ হতো। তারা বলেন, কুটনীতিকরা নেত্রীকে বুঝিয়েছেন গত বছর স্লোগান হয়েছে, এবার অনভিপ্রেৎ ঘটনা ঘটতে পারে। সেই দিক বিবেচনা করেই প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন তিনি নিজেই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন এবং জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন। প্রধানমন্ত্রীর সাথে মঞ্চে ছিলেন শুধু পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন।
প্রধানমন্ত্রী নিজে সভাপতিত্ব করবেন এই ঘোষণায় অনেকেই উল্লাস প্রকাশ করেছেন। চারিদিকে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে গেল নতুন কমিটি আসছে। কারো কারো নামও বাজারে সবার মুখে মুখে ছিলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন কাজ করলেন তাতে করে শাপও মরলো আবার লাঠিও ভাঙ্গলো না। যাকে বলে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার। তিনি ড. সিদ্দিকুর রহমানকে সভাপতিত্ব করতে দিলেন না কিন্তু আস্থাটা শেষ পর্যন্ত ড. সিদ্দিকুর রহমানের উপরই রাখলেন। যারা বিরোধিতা করেছেন তাদের আংশিক স্বপ্ন পূরণ হলো আবার প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তও বাস্তবায়িত হলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যার প্রমাণ দিলেন সংবাদ সম্মেলনে। তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কমিটি আছে, তবে সম্মেলন হওয়া জরুরী। তিনি যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কমিটি নিজ হাতে করেন, আগামীতেও নিজ হাতে করবেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কমিটি হবে না, জোর করে তাঁর কাছ থেকে কমিটি বা অন্য কিছু আদায় করা যাবে না। সুতরাং সবার মনে রাখা উচিত নিজের স্বার্থ নয়, দলের স্বার্থ দেখতে হবে, স্লোগান নয়, নেত্রীকে সম্মান করতে হবে। বিরোধিতা করে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতাদের হেয় বা ক্ষতি না করে সাংগঠনিক পথে উপায় বের করা উচিত। প্রধানমন্ত্রীর নিজের হাতে করা কমিটি কোন দিন শক্তি, হুমকি- ধামকি দিয়ে বাতিল করানো যাবে না। এই কথাটি সবার মনে রাখা উচিত।
এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমি আবার নতুন করে শুরু করবো। তবে পার্টি প্রধানের অনুমোদিত কমিটির সদস্যদের নিয়েই আমি কাজ করবো।