হু হু করে বাড়ছে পণ্যের দাম

ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মাথায় হাত

নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী : একদিকে বাড়ছে ক্রেডিট কার্ডের ইন্টারেস্ট রেট, অন্যদিকে বাড়ছে গাড়ি, হোমলোনসহ সব ধরনের লোনের ইন্টারেস্ট রেট। এ ছাড়া বাড়ছে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। গ্যাসের দাম বাড়ার পর কিছুটা কমলেও এখনো আগের দামে আসেনি। পণ্য পরিবহনে কনটেইনারের ভাড়া বেড়েছে তিনগুণ। বাজারে জিনিসের সংকট, লেবার সংকট- সব মিলিয়ে মানুষের হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে প্রায় সবকিছুই। চাইলেও বেশি সুদ দিয়ে স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে বাড়ি কেনার সুযোগ থাকছে না। পাশাপাশি বাড়ছে বাড়ি ভাড়া। বাড়তি বাড়ি ভাড়া কুলাতে না পেরে অনেকেই সিটি ছেড়ে যাচ্ছেন। যারা থাকছেন, তারা বাড়তি ভাড়ায় কুলাতে না পেরে স্বল্প ভাড়ার বাসা খুঁজছেন। অনেকেই চান অ্যাফোর্ডেবল হাউজিংয়ে বাসা নিতে। আবেদনও করেন। কিন্তু এটি পাওয়া যেন সোনার হরিণ। এখানে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বাসা ভাড়া দেওয়া হলেও অনেকেই আবেদন করে বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও বাসা পান না। লটারিতে বাসা মেলে না। আবার এমনও আছে, লটারিতে বাসা পেলেও ফুলটাইম চাকরি করলেও স্টুডেন্ট থাকার কারণে বাসা পান না। ভুক্তভোগীদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসলে সব দিক থেকেই এত সমস্যার মধ্যে মানুষ আছে যে তারা কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম হু হু করে বাড়ছেই। এর লাগাম কেউ টেনে ধরতে পারছে না। স্বল্প আয়ের মানুষেরা বাজারের খরচ কমানোর চেষ্টা করেও পারছে না। আগে যারা ৪০০-৫০০ ডলারে বাজার খরচ চালাতেন, এখন তা করতে ৮০০ থেকে ১০০০ ডলারের প্রয়োজন হচ্ছে। খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এ অবস্থায় বাজেট ধরে রাখতে বেশির ভাগ মানুষ খরচ কমাতে খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। এতে পুষ্টির অভাবে তাদের স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। লাজলজ্জার ভয়ে তারা বিষয়টি কাউকে বলতেও পারছেন না। জিনিসপত্রের দাম কমারও কোনো আশার বাণী আসছে না। এতে ক্রেতাদের অনেকেই হতাশ। তাদের কপালে চোখ উঠে যাচ্ছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ অবস্থায় ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মাথায় হাত। তারা নিরুপায় ও অসহায়।
দাম বাড়ার কারণে কেবল ক্রেতাদের যে সমস্যা হচ্ছে তা নয়, অনেক ব্যবসায়ীও বাড়তি দামে জিনিস কেনায় আগের মতো প্রফিট করতে পারছেন না। তবে একশ্রেণির ব্যবসায়ী বাজারে জিনিসের দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে সব জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। আগের স্টক থাকলেও বাড়তি দামেই বিক্রি করছেন।
বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কোনো জিনিসই আর আগের দামে নেই। সব জিনিসের দাম বেড়েছে ৪০-৫০ শতাংশ। ক্রেতারা কিনছেন আরো ১০-১৫ শতাংশ বেশি দামে। পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং আমদানিকারকেরা বিভিন্ন দোকান ও গ্রোসারিতে যে পণ্য সরবরাহ করছেন, সেখানে তারা ইনভয়েসের মধ্যে লিখে দিচ্ছেন ‘সরি ফর দ্য ইনকনভিনিয়েন্স, প্রাইস হ্যাজ গোন আপ’। প্রতিটি ইনভয়েসে এ কথা লেখা থাকার কারণে কিছু বলতেও পারছেন না।
এ ব্যাপারে ফাতেমা ব্রাদার্স ও ফাতেমা গ্রোসারির ব্যবসায়ী ও কমিউনিটির নেতা ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার বলেন, আমরা জিনিসপত্রের দাম নিজেরা বাড়াচ্ছি না। বাজারে প্রতিনিয়ত জিনিসের দাম বাড়ছে। ফলে আমরা বেশি দামি কিনছি। আগে যে পেঁয়াজের ব্যাগ আমরা দুই ডলারে কিনে তিন ডলারে বিক্রি করতাম, সেই পেঁয়াজ এখন ছয় ডলারে কিনছি আর বিক্রি করছি সাত ডলারে। প্রফিট মার্জিন কিন্তু আগে যে এক ডলার ছিল সেটাই আছে। আগে কম দামে কেনার কারণে ইনভেস্ট করতে হতো কম। এখন বেশি দামে কেনায় ইনভেস্ট করতে হচ্ছে বেশি।
তিনি বলেন, বাজারে জিনিসের সংকট রয়েছে। করোনার সময়ে অনেকেই কাজ করেননি বলে উৎপাদন কম হয়েছে। সেই সাথে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য বাজারে সরবরাহ করতে গিয়ে জ্বালানির খরচ বাড়ছে। গ্যাসের দাম অনেক বেড়ে গেছে। ফলে পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়েছে। এ অবস্থায় লোকাল বাজারের সব জিনিসের দাম বেশি। এটি লোকাল বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাজার সব জায়গায়ই আছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য আমদানি করার ক্ষেত্রে খরচ বেড়েছে। আমরা এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে ফ্রোজেন এবং শুকনো ফুড আমদানি করি। কনটেইনারের ভাড়া আগে যা ছিল প্যান্ডামিকের কিছুদিন পর থেকে তা আস্তে আস্তে বাড়ছে। এখন তিনগুণ বেড়েছে। ফলে কনটেইনারের বেশি ভাড়াও এখান থেকে আমদানিকারকেরা তুলছে। সেই সাথে আছে গ্যাসের বাড়তি মূল্য। সব মিলিয়ে এখানে পণ্য বাজার পর্যন্ত আনার খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
জিনিসের দাম বাড়ার অজুহাতে কেউ সুযোগ নিচ্ছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ কেউ নিতে পারেন। কারণ, বাজারে সব জিনিস যদি সবার কাছে থাকে, তাহলে সবার দাম একই থাকতে হবে। কিন্তু কোনো জিনিস যদি কেবল একজনের কাছেই থাকে, তাহলে তিনি বেশি দামে বিক্রি করলেও কিছু করার থাকে না।
মাছ বাজারের কর্ণধার রুমি ভুঁইয়া বলেন, ইনফ্ল্যাশনের কারণে কেবল আমেরিকা নয়, পুরো পৃথিবীতেই অবস্থা খারাপ হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমাদের বাজারে বড় প্রভাব পড়েছে। সেখান থেকে গম ও ভুট্টার প্রায় ৭০ শতাংশ এখানকার চাহিদা মেটাত। কিন্তু এখন সরবরাহ সেভাবে নেই। ফলে তীব্র সংকট চলছে। যদিও সরকার তুর্কি থেকে গ্রেইন আনার চেষ্টা করছে। সেটি হলে আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে এগুলো আসবে। তখন একটা ভালো অবস্থা হতে পারে। তিনি বলেন, আগে ৩২ লিটারের এক গ্যালন তেল কিনতাম ১৮ ডলারে আর বিক্রি করতাম ২০ ডলারে, এখন একই তেল কেনা হচ্ছে ৪৮ ডলারে আর বিক্রি করছি ৫০ ডলারে।
জ্যামাইকার একজন ক্রেতা বলেন, একাধিক দোকানে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম গত সপ্তাহে যা ছিল তা নেই। প্রতিদিনই কিছু কিছু করে বাড়ছে। এ কারণে মানুষের কপালে চোখ উঠে যাচ্ছে। কিছুই করার নেই। অসহায়ের মতো আমরা ক্রেতারা পরিস্থিতির শিকার।
জ্যাকসন হাইটসে কেনাকাটা করেন এমন একজন ক্রেতা বলেন, আগে যে বাজার করতাম ১০০ ডলারে, এখন তা কিনতে হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭৫ ডলারে। এ ছাড়া আগে যেখানে মাসে তেল খরচ হতো ৬০ ডলার, এখন তাতে লাগছে প্রায় ১৫০ ডলার। পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডের ইন্টারেস্ট বাড়ানোয় ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটা করতে আরো বেশি দাম পড়ছে।
অন্য একজন ক্রেতা বলেন, বাজারে শাকসবজি, মাংস, মাছ থেকে শুরু করে চাল, ডাল, তেল, লবণ কোনো কিছুর দামই স্থিতিশীল নেই। এই বাড়তি দামের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।