২০ দলীয় জোটের অস্তিত্ব নিয়ে গুঞ্জন

নিজস্ব প্রতিনিধি : বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের সম্প্রসারণ করে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল ১৮ দলীয় জোট গঠিত হয়। এরপর আরও দুটি দলের সমন্বয়ে তা রূপ নেয় ২০ দলীয় জোটে। মূলত ডানপন্থী ও মধ্য ডানপন্থী দলগুলো নিয়েই এই জোট গঠিত হয়।
এদিকে কারাগারে যাওয়ার আগে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, এখন আর কোনো জোট নয়, আমরা যুগপৎ আন্দোলনের কথা বলছি। এর পর থেকে ২০ দলীয় জোট নিয়ে শুরু হয় নানান গুঞ্জন। মির্জা ফখরুলের ঘোষণার পরই মূলত ছোট দলগুলো নিজেরা বৈঠক করে আলাদা জোট করার সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে শরিক হতে তাদের অসুবিধা না হয়।
এরই অংশ হিসেবে ২২ ডিসেম্বর আত্মপ্রকাশ ঘটে ১২ দলীয় জোটের। সরকারবিরোধী ও সমমনা ১২টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে ওইদিন আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোট আত্মপ্রকাশ করে। তবে এ জোটের অধিকাংশই বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সদস্য। এই জোটের আত্মপ্রকাশের পর ২০ দলীয় জোটের অস্তিত্ব নিয়ে দেশের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে ব্যাপক গুঞ্জন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর জোটের ভাঙা-গড়ার নতুন ফসল এই ১২ দলীয় জোট।
তবে কাগজে-কলমে ২০ দলীয় জোট না থাকলেও কার্যক্রম বাস্তবায়নে এর ভূমিকা এখনো বিদ্যমান বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জোট ভেঙে দেওয়া হলেও বিএনপির সব কর্মসূচিতে আলাদাভাবে ১২ দলীয় জোট অংশ নেবে বলে জানান নেতারা। ১২ দলীয় জোট গঠন যুগপৎ আন্দোলনেরই একটি কৌশলগত রূপ বলে জানান তারা।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, জোটবদ্ধ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে এবার যুগপৎ আন্দোলন গড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে জামায়াত-নির্ভরতা কাটানো এবং রাজনীতিতে ‘বিএনপি-জামায়াত’ নামে যে নেতিবাচক প্রচার রয়েছে, সেটি কাটানোও এর অন্যতম লক্ষ্য। তারই অংশ হিসেবে সর্বশেষ ৯ ডিসেম্বর ২০ দলীয় জোটকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেওয়া হয়।
১২ দলীয় জোটের নেতারা জানান, বিএনপির ঘোষিত সব কর্মসূচিতে তাদের সমর্থন আছে, ছিল, থাকবে। যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নিতে কৌশলগতভাবে তারা নতুন জোট গঠন করেছেন।
১২ দলীয় জোটের দলগুলো হলো জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় দল, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলাদেশ এলডিপি পার্টি, মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান এহসানুল হুদা বলেন, কার্যত ২০ দলীয় জোট নেই। কৌশলগত কারণে ঘোষণা দিচ্ছে না বিএনপি। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে ৯ ডিসেম্বর আমাদের বলে দেওয়া হয়েছে, আপনারা এখন থেকে ২০ দলীয় ব্যানারে কার্যক্রম করা থেকে বিরত থাকুন। যার যার দলগত অবস্থান থেকে সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে শরিক হোন।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির পাশে থাকব। আন্দোলনের কৌশল হিসেবে ১২ দলীয় জোটের আত্মপ্রকাশ। এটা নয় যে, বিএনপির সঙ্গে পোলটি দিয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করব। নতুনভাবে জোট হলেও ১২ দলীয় জোট বিএনপির সঙ্গেই হবে, যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেবে।
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা ২০ দলীয় জোটভুক্ত ছিলাম। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়নি। গত ৯ ডিসেম্বর বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে, সেই বৈঠকে ওনারা আমাদের বলেছেন, এখন থেকে ২০ দলীয় জোট ব্যবহার করবেন না। তবে আপনারা যৌথভাবে চলতে পারেন। তিনি বলেন, জোটের বড় দল বিএনপি, তাই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে বাদ দিলে থাকে ১৮ দল। আন্দালিব রহমান পার্থের নেতৃত্বাধীন বিজেপি ২০ দল ছেড়ে চলে গেছে, পরবর্তীতে চলে যায় খেলাফত মজলিস। অবশিষ্ট থাকে ১৬ দল। তবে কর্নেল অলি আহমেদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি আমাদের নতুন জোটে এখনো আসেনি। ১৬ দলের মধ্যে ১২টি দল ইতিমধ্যে নতুনভাবে জোটবদ্ধ হয়েছে।
জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামান হায়দার বলেন, প্রয়োজন শেষে জোট থাকে না। কিন্তু প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলনে জোট অবিচ্ছেদ অংশ। বিএনপির সঙ্গে আমাদের যে ঐক্য ও সমঝোতা, তা অটুট থাকবে। আরও বৃহত্তর আন্দোলনে অংশ নিতে একটু ভিন্ন কৌশলে নতুন জোট গঠন করা হয়েছে। ২০ দলীয় জোট নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝির কিছু নেই। আমরা যুগপৎভাবে আন্দোলনে অগ্রসর হব।
সার্বিক বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা ১০ দফা দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি সংস্কার করে পরবর্তীতে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে ২৭ দফা ঘোষণা দিয়েছি। যেহেতু ২০ দলীয় জোট আনুষ্ঠানিকভাবে নেই, তাই দলগুলো এখন যুগপৎভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেবে বলে প্রত্যাশা করছি।