২৬ ধনীর হাতে বিশ্বের অর্ধেক গরিবের সমান সম্পদ

বিশ্বচরাচর ডেস্ক : পুরো মানবকুলে সবচেয়ে দরিদ্র অর্ধেক মানুষের সমপরিমাণ সম্পদের মালিক বিশ্বের শীর্ষ ২৬ ধনী ব্যক্তি। এই ২৬ জন ধনীর সম্পদের পরিমাণ এক কোটি ৪০ লাখ কোটি ডলার, যা বিশ্বের দরিদ্রতম ৩৮০ কোটি মানুষের সম্পদের সমান। শুধু তাই নয়, গত এক বছরে বিশ্বের বিলিয়নেয়ারদের সম্পদ বেড়েছে প্রতিদিন ২৫০ কোটি ডলার করে। আর এই এক বছরে ৩৮০ কোটি মানুষের সম্পদ কমেছে ১০ হাজার কোটি ১২ লাখ ডলার।

দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডাবিøউইএফ) সম্মেলন সামনে রেখে অক্সফাম গত ২১ জানুয়ারি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে। এতে বিশ্বে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিশ্বের সম্পত্তি অল্প মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি। ফোর্বস ম্যাগাজিনে ২০১৮ সালের মার্চে বিলিয়নেয়ারদের বার্ষিক সম্পত্তির বিবরণ পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

বিশ্বের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অর্থনীতিবিদ ও সেলিব্রিটিদের নিয়ে সুইজারল্যান্ডে দাভোসে প্রতি বছর ডাবিøউইএফ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই মানবাধিকারকর্মী ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো ধনী-দরিদ্র বৈষম্য হ্রাসের দাবিতে সোচ্চার হয়।

প্রতিবেদনে অক্সফাম জানিয়েছে, সর্বশেষ ২০১৮ সালেও বিশ্বের ধনীরা আরো ধনী হয়েছে এবং দরিদ্ররা আরো দরিদ্র হয়েছে। সম্পত্তির এই বিশাল বৈষম্য বিশ্বের দারিদ্র্যমুক্তির লড়াইকে বাধাগ্রস্ত করছে উল্লেখ করে বলা হয়, যদি শীর্ষ ধনীদের আয়ের ১ শতাংশ সম্পদে কর আরোপ করা হয়, তাহলে এক বছরে ৪১৮ বিলিয়ন ডলার অর্থ আসবে। আর এই অর্থ দিয়ে স্কুলে না যাওয়া শিশুদের শিক্ষা দেওয়া এবং স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু এড়ানো সম্ভব।

অক্সফাম জানায়, বিশ্বের দুই হাজার ২০০ বিলিয়নেয়ারের সম্পত্তির মূল্য ২০১৮ সালে বেড়েছে ৯০ হাজার কোটি ডলার। আর প্রতিদিন বেড়েছে আড়াই শ কোটি ডলার। বিশ্বের ধনকুবেরদের সম্পত্তি বৃদ্ধির হার ১২ শতাংশ। বিপরীতে বিশ্বের দরিদ্রতম অর্ধেক মানুষের সম্পত্তি কমেছে ১১ শতাংশ। এর ফলে বিশ্বের অর্ধেক মানুষের সমান সম্পত্তি জমা হয়েছে বিলিয়নেয়ারদের হাতে।

প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, ২০১৬ সালে বিশ্বের অর্ধেক মানুষের সম্পত্তির মালিক ছিল ৬১ জন, ২০১৭ সালে ছিল ৪৩ জন এবং গত বছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ২৬ জনে।

এ ছাড়া গত ১০ বছরের আর্থিক মন্দার পরও এই সময়ে বিলিয়নেয়ারদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৭ ও ২০১৮ সালের প্রতি দুই দিন অন্তর নতুন একজন বিলিয়নেয়ার হয়েছেন। যুক্তরাজ্যের ধনীদের ১০ শতাংশের তুলনায় দরিদ্রতম ১০ শতাংশ মানুষ উচ্চহারে কর দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি জেফ বেজসের সম্পত্তি বেড়েছে ১০ হাজার কোটি ১২ কোটি ডলার। তার এই সম্পত্তির মাত্র ১ শতাংশ ১০ কোটি পাঁচ লাখ জনসংখ্যার দেশ ইথিওপিয়ার পুরো স্বাস্থ্য বাজেটের সমান।

অক্সফামের প্রচারণা ও নীতিবিষয়ক পরিচালক ম্যাথিউ স্পেনসার বলেন, চরম দারিদ্র্যে বাস করা মানুষের সংখ্যা কমে আসা গত শতকের শেষার্ধের বড় অর্জন। কিন্তু ক্রমবর্ধমান অসমতা ভবিষ্যতে এই খাতের অগ্রগতিকে জটিল করে তুলছে। আমাদের অর্থনীতি যে পথে চলছে তাতে সম্পত্তি ক্রমবর্ধমান ও এবং অন্যায্য হারে কয়েকজনের কাছে জমা হচ্ছে।

স্পেনসার আরো বলেন, এটা এমন হওয়া উচিত নয়। সবাইকে বেঁচে থাকার সুযোগ দেওয়ার পর্যাপ্ত সম্পদ রয়েছে পৃথিবীতে। সরকারগুলোর উচিত সম্পদ ও ব্যবসায়ীদের কর বাড়ানো, যাতে করে তারা জনগণের জীবন পরিবর্তনের জন্য উন্নত মানের সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, অনেক দেশ সরকারি সেবা খাতে বিনিয়োগ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বৈষম্যকে তীব্রতর করে তুলছে। স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ায় ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২৬ কোটি ২০ লাখ শিশু এখনো স্কুলে যেতে পারছে না, কারণ তাদের মা-বাবারা স্কুলের ফি, পোশাক ও বই কিনে দিতে পারছে না।

বিশ্বের ২৬ শীর্ষ ধনী

১. জেফ বেজস : তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রিটেইলার প্রতিষ্ঠান আমাজনের মালিক। বয়স ৫৪। তার নিট সম্পত্তির পরিমাণ ১২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।

২. বিল গেটস : মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সিইও। তিনি এখনো প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড মেম্বার। ৬৩ বছর বয়সী যুক্তরাষ্ট্রের এই বিলিয়নেয়ারের নিট সম্পদের পরিমাণ আট হাজার ৯০৫ কোটি ডলার।

৩. ওয়ারেন বাফেট : যুক্তরাষ্ট্রের বৈচিত্র্যময় শিল্পের বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটের সম্পত্তির পরিমাণ সাত হাজার ৮০৭ কোটি ডলার। তার বয়স ৮৮ বছর।

৪. বার্নার্ড আরনল্ট : ৬৯ বছর বয়সী কনজ্যুমার খাতের এই ফরাসির নিট সম্পত্তির পরিমাণ ছয় হাজার কোটি ৬০১ লাখ ডলার।

৫. আমানসিও ওর্তেগা : স্পেনের ৮২ বছর বয়সী এই ধনকুবের পাঁচ হাজার ৭০৭ কোটি ডলার।

৬. কার্লোস সিøম : ৭৮ বছর বয়সী এই ম্যাক্সিকানের সম্পত্তির পরিমাণ পাঁচ হাজার ৬০০ কোটি ডলার।

৭. মার্ক জাকারবার্গ : ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা ৩৪ বছর বয়সী মার্ক জাকারবার্গ পাঁচ হাজার ২০৩ কোটি ডলারের সম্পত্তির মালিক।

৮. ল্যারি পেজ : গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ বছর বয়সী এই ধনীর সম্পত্তির পরিমাণ পাঁচ হাজার পাঁচ কোটি ডলার।

৯. সার্জেই ব্রিন : তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়ী। ৪৫ বছর বয়সী এই ধনীর সম্পত্তির পরিমাণ চার হাজার ৯০১ কোটি ডলার।

১০. ল্যারি এলিসন : ওরাকলের সবেক সিইও ৭৪ বছর বয়সী এই আমেরিকান চার হাজার ৮০৯ কোটি ডলারের মালিক।

১১. ফ্রান্সিসকো বেটেনকোর্ট মেয়ার্স : ৬৪ বছর বয়সী এই ফরাসি চার হাজার ৫০১ কোটি ডলারের সম্পত্তির মালিক।

১২. জিম ওয়ালটন : আমেরিকার ওয়ালমার্টের প্রতিষ্ঠাতার ছোট ছেলে জিম ওয়ালটনের বয়স ৭৪। তার সম্পত্তির পরিমাণ চার হাজার ৪০০ কোটি ডলার।

১৩. রব ওয়ালটন : ওয়ালমার্টের প্রতিষ্ঠাতার বড় ছেলে রব ওয়ালটনের সম্পত্তির পরিমাণ চার হাজার ৩৮০ কোটি ডলার।

১৪. মিশেল বøুমবার্গ : বøুমবার্গের এলপির এই প্রতিষ্ঠাতার বয়স ৭৬ বছর। তার সম্পত্তির পরিমাণ চার হাজার ৩৪০ কোটি ডলার।

১৫. মুকেশ আম্বানি : ভারতের ৬১ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ীর সম্পত্তির পরিমাণ চার হাজার ৩০০ কোটি ডলার।

১৬. চার্লস কোচ : ৮৩ বছর বয়সী এই আমেরিকানের সম্পত্তির পরিমাণ চার হাজার ২৯০ কোটি ডলার।

১৭. ডেভিড কোচ : চার্লস কোচের ভাই ৭৮ বছর বয়সী এই আমেরিকানের সম্পত্তির পরিমাণ চার হাজার ২৯০ কোটি ডলার।

১৮. এলিস ওয়ালটন : বয়স ৬৯। যুক্তরাষ্ট্রের এই ধনকুবেরের সম্পত্তির পরিমাণ চার হাজার ২৬০ কোটি ডলার।

১৯. স্টিভ বলমার : যুক্তরাষ্ট্রের ৬২ বছর বয়সী এই ধনীর সম্পত্তির পরিমাণ তিন হাজার ৭৩০ কোটি ডলার।

২০. জ্যাক মা : আলিবাবা ডটকমের মালিক এই চীনা ধনীর সম্পত্তির মালিক তিন হাজার ৪৮০ কোটি ডলার। তার বয়স ৫৪ বছর।

২১ ও ২২. জন মার্স ও জ্যাকুলিন মার্স : ৮৩ ও ৭৯ বছর বয়সী এই সহোদরের প্রত্যেকের সম্পত্তির পরিমাণ তিন হাজার ২৯০ কোটি ডলার।

২৩. পনি মা : ৪৭ বছর বয়সী এই চীনা নাগরিকের সম্পত্তির পরিমাণ তিন হাজার ১৪০ কোটি ডলার।

২৪. হিউ কা ইয়ান : ৬৯ বছর বয়সী এই চীনার সম্পত্তির মালিক দুই হাজার ৯৮০ কোটি ডলার।

২৫. শেলডন অ্যাডেলস : ৮৫ বছর বয়সী এই আমেরিকানের সম্পত্তির পরিমাণ দুই হাজার ৯৪০ কোটি ডলার।

২৬. ফিল নাইট : নাইকির মালিক এই আমেরিকানের সম্পত্তির পরিমাণ দুই হাজার ৮৭০ কোটি ডলার।