৪০ লাখ অভারতীয়কে রাজনৈতিক কার্ড হিসেবে ব্যবহার করছে নয়াদিল্লি

নিজস্ব প্রতিনিধি : আসামে বসবাসরত ৪০ লাখ ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে ভারত। বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি করতে চায় এ উদ্দেশ্যেই। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণেই নয় শুধু, নয়াদিল্লি ঢাকার ওপর কার্যকর চাপ রাখতে চায়। চীনের প্রতি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতাই এর নেপথ্যের কারণ। ভারতীয়দের মতে, আসামে যে ৪০ লাখ অভারতীয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, তাদের প্রায় সবাই বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ও তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসামে গেছে। দেশ বিভাগের সময় থেকে ৭১-এ স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে এরা সেখানে গিয়ে অবস্থান করেছে। তাদের বিতাড়িত করার কর্মসূচি নিয়েছে নয়াদিল্লি।
আসামে অবস্থানরতদের সবাই সুদীর্ঘকাল ধরে সেখানে অবস্থান করছেন। ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এমপিও হয়েছেন। সানাউল্লাহ মিয়া নামের এক ব্যক্তি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ১৭ বছর চাকরি করার পর অবসর নেন। তাকে অভারতীয় হিসেবে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হয়। জেলও খাটতে হয় তাকে। পরে আদালতের নির্দেশে তিনি মুক্তি পান। সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পান এদের অনেকে। এখন দুর্ভাবনায় অনিশ্চিত জীবন যাপন করছেন। পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতজুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের এই আচরণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হলেও নিরুদ্বিগ্ন নয়াদিল্লি।
জানা যায়, আগামী ৭ আগস্ট নয়াদিল্লি যাচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হবেন তিনি। এতে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন নিয়ে অমিত শাহ আলোচনা করবেন। যদিও বিষয়টি আলোচ্য সূচিভুক্ত নয়। তা সত্তে¡ও ভারতীয় পক্ষ তা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরবে। নয়াদিল্লি এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তিতে আসতে চায়। পাঁচ বছরের মধ্যে এই অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা তাদের। এ ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় একটি কমিটি করার প্রস্তাব দেবে ভারত। অভিবাসীরা যে বাংলাদেশের নাগরিক, ভারত তা প্রমাণের জন্য কাজ করবে। তারা তাদের কথিত জন্মস্থানে গিয়ে সরেজমিনে যাচাই করবে। এমনকি সিএস, আরএস দলিলও যাচাই করবে। ১৯৪৭ সাল এবং ৭১ পরবর্তী সময়ও তাদের অবস্থান নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া হবে। কিন্তু বাংলাদেশ এ ধরনের প্রস্তাবের ঘোরতর বিরোধী। বাংলাদেশের কোনো নাগরিক ভারতে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ। এ ব্যাপারে কোনো দ্বিপক্ষীয় কমিটি করার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ। এ নিয়ে বিরোধ বাড়াতে চায় না বাংলাদেশ। তবে কোনো অবস্থাতেই ভারতীয় প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার নীতি নিয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রে আরো জানা যায়, ভারত সরকার আসাম-বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর কাঁটাতারের বেড়া দিতে চায়। সীমিতভাবে ২০ কিলোমিটার বেড়া এরই মধ্যে দেওয়া হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় মানুষের চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাওয়ার বসানো হয়েছে। বাংলাদেশ ভারতীয় সীমান্তে ভারত সরকার কর্তৃক বেড়া দেওয়ার বিপক্ষে নয়। বাংলাদেশ থেকে কারো অবৈধভাবে প্রবেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ। সীমান্তে চোরাচালান, অনুপ্রবেশ রোধে বাংলাদেশ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে। জঙ্গি, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ রোধে বাংলাদেশ কার্যকর ব্যবস্থা আগে থেকেই নিচ্ছে। ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো গ্রুপ, ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা যাতে নতুন করে মাথাচাড়া দিতে না পারে, বাংলাদেশে যাতে তারা গোপনে অবস্থান করতে না পারে, সে ব্যাপারে অধিকতর সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ করা হবে।
বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত মাধুর্য ও হৃদ্যতাপূর্ণ দৃশ্যমান হলেও ভারত কোনো কিছুই তার স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে করছে না। প্রায় ৪০ লাখ ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো এই প্রক্রিয়ারই অংশ। বাংলাদেশের ওপর চাপ রাখার পাশাপাশি অভারতীয় হিসেবে চিহ্নিতরা যে ভারতীয় নন, তা প্রতিষ্ঠা করতে চায় নয়াদিল্লি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক থাকায় ভারত সরকার এই পর্যায়েই এ ব্যাপারে কঠোর কোনো পন্থা না নিলেও ভবিষ্যতে এই নীতির পরিবর্তন ঘটাতেও পারে। অবৈধ অভিবাসীদের রাজনৈতিক কার্ড হিসেবে ব্যবহার করবে। প্রয়াত রাজীব গান্ধী হঠাৎ করেই নয়াদিল্লি থেকে কয়েক লাখ বাংলা ভাষাভাষীকে পুশইন করেছিলেন। ভবিষ্যতে একই পথ অনুসরণ করতে পারে ভারত, যদি বাংলাদেশ সরকার তাদের অনুগত, বিশ্বস্ত না থাকে।