‘৪৭ বছরেও স্বাধীনতা আসেনি ক্রীড়াঙ্গনে’

স্পোর্টস রিপোর্ট : ‘স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও ক্রীড়াঙ্গনে প্রকৃত স্বাধীনতা আসেনি। এখনও ক্ষমতাশালী, কালো টাকাধারী চিহ্নিত মাস্তান ও দুর্নীতিবাজরা ক্রীড়াঙ্গন দখল করে রেখেছে। লুটেপুটে খাচ্ছে তারা। এ জন্যই কী দেশ স্বাধীন হয়েছিল?’- কথাগুলো বলেছেন বর্ষীয়ান ক্রীড়া সাংবাদিক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান।

দুর্নীতিমুক্ত ক্রীড়াঙ্গনের ব্যাপারে নিজের হতাশার কথা জানান এই ক্রীড়া সাংবাদিক। তার কথা, ‘ক্রীড়া উন্নয়নে কোনো পরিকল্পনা নেই। অপরিকল্পিতভাবে চলছে সবকিছু। বিচ্ছিন্নভাবে, ব্যক্তিগত উদ্যোগে ক্রীড়াঙ্গন এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলছে। সমষ্টিগতভাবে নীতিমালা তৈরি করে ক্রীড়ার উন্নতির চেষ্টা হয়নি।’

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু বলেন, ‘১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার টানে যুদ্ধে নেমেছিলাম। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ফুটবলকে অস্ত্র বানিয়ে লড়াই করেছি। স্বপ্ন দেখেছিলাম স্বাধীন দেশে স্বাধীন ক্রীড়াঙ্গন প্রতিষ্ঠার। যেখানে প্রকৃত ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়াবিদদের যথাযথ মূল্যায়ন হবে। এ দেশের ক্রীড়াবিদরা মহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনবে। কিন্তু স্বাধীনতার পর আমরা কী দেখলাম? যুগে যুগে ক্ষমতাসীনরা কুক্ষিগত করে রেখেছে ক্রীড়াঙ্গনকে। ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে পদ-পদবিকে। ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়াবিদরা ছিলেন উপেক্ষিত। এ জন্যই কী আমরা যুদ্ধ করেছিলাম? আমি মনে করি ক্রীড়াঙ্গনে একটি মুক্তিযুদ্ধ দরকার। যে যুদ্ধ হবে দুর্নীতিবাজ, কালো বাজারিদের কাছ থেকে ক্রীড়াঙ্গনকে মুক্ত করার যুদ্ধ।’
আক্ষেপ আর হতাশার কথা জানালেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের আরেক খেলোয়াড় আমিনুল ইসলাম সুরুজ।

বরিশাল তথা দক্ষিণ বাংলার এই কৃতী খেলোয়াড় বলেন, ‘আজ মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। ১৯৭১ সালে যেমন পাক হানাদার বাহিনীর এদেশীয় এজেন্টরা আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল, আজ তেমনি একটি চক্র ক্রীড়াঙ্গনকে দখল করে রেখেছে। তারা নিজেদের স্বার্থে ক্রীড়াঙ্গনকে ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। যখন যে সরকার আসে, তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লুটেপুটে খাচ্ছে এসব স্বার্থান্বেষীরা। খেলাধুলার উন্নয়নের কথা তারা ভাবেন না। পাকিস্তান আমলে আমাদের যেভাবে উপেক্ষা করা হতো, দাবিয়ে রাখা হতো, আজও একই কায়দায় প্রকৃত সংগঠক ও খেলোয়াড়দের দূরে ঠেলে দেয়া হয়েছে। রাজনৈতিক পেশিশক্তি ব্যবহার করে দখল করে নেয়া হয়েছে খেলাধুলাঙ্গন। স্বাধীনতা দিবসের আমার প্রত্যাশা থাকবে, স্বাধীন ক্রীড়াঙ্গন প্রতিষ্ঠিত হবে, যা হবে শুধু খেলোয়াড় ও সংগঠকদের।’

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সদস্য ও সাবেক তারকা ফুটবলার গোলাম রব্বানী হেলাল বলেন, ‘দেশের মুক্তিযোদ্ধারা ও যুদ্ধাহত পরিবারের সদস্যদের অনেকেই আজ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ৪৭ বছর পার হলেও তাদের জীবনে স্বাধীনতা আসেনি। ক্রীড়াঙ্গনে অনেকেই রয়েছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক অবদান রেখেছেন। তাদের খোঁজখবর আজকাল কেউ রাখেন না। সবাই ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে। একটা সময় স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে বিভিন্ন প্রদর্শনী খেলা হতো। যেই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল মুক্তিযুদ্ধের সময় ফুটবল খেলে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সেই ফুটবলেরই কোনো প্রদর্শনী ম্যাচ হয় না স্বাধীনতা দিবসে। এর চেয়ে বড় লজ্জার আর কী হতে পারে। আমি প্রত্যাশা করি, একটি সুস্থ সুন্দর ও দুর্নীতিমুক্ত ক্রীড়াঙ্গন সৃষ্টি করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উপহার দেয়ার জন্য সবাই এক কাতারে মিলিত হবেন।’

জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক তারকা ফুটবলার সৈয়দ রুম্মান বিন ওয়ালীর কথা, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধ করতে পারিনি। তখন খুব ছোট ছিলাম। দেশের স্বাধীনতার জন্য সবাই তখন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আজ আমাদেরও একসঙ্গে দেশের প্রয়োজনে লড়াই করা উচিত। এ লড়াই স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক ক্রীড়াঙ্গন প্রতিষ্ঠার লড়াই। আজ পাতানো ম্যাচের মাধ্যমে ফুটবলকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। ক্রিকেটাঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে নৈরাজ্য। খেলোায়াড় বানিয়ে আদম পাচারের ঘটনা অহরহ ঘটছে। আজ পদ-পদবি ব্যবহার করে ব্যবসা-বাণিজ্য বাগিয়ে নিচ্ছেন ভুঁইফোড় কর্মকর্তারা। বিতর্কিত ব্যক্তিরা ঢুকে পড়েছেন ক্রিকেটাঙ্গনে। এসব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ক্রীড়াঙ্গন গড়ে তোলাটাই আজকের স্বাধীনতা দিবসের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত।’

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সংগঠক ও খেলোয়াড় সাইদুর রহমান প্যাটেল বলেন, ‘বর্তমান ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যেমন এগিয়ে চলছে, আমি আশা করব খেলাধুলার উন্নয়নের গতিও একইভাবে এগোবে।’