৪৮তম স্বাধীনতা দিবস আসুক ’৭১-এর চেতনার আগুন জ্বেলে

মার্চ মাস বাঙালি জাতির কাছে কেবলই ইংরেজি ১২ মাসের একটি মাস নয়। শুধুই ক্যালেন্ডারের একটি পাতা নয়। বাঙালির কাছে মার্চ মানে অনেক কিছু। মার্চ মানে ’৭১-এর উত্তাল মার্চ। মার্চ মানে স্টেডিয়ামে ক্রিকেট বন্ধ। রাজপথ উত্তপ্ত স্লোগানে-বিক্ষোভে-প্রতিবাদে। মার্চ মানে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষায় সমগ্র বাঙালি জাতি উন্মুখ। মার্চ মানে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ মার্চ মানে মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনা- ‘ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা কর।’

মার্চ মানে ২৫ মার্চ বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতম আক্রমণ। ঘুমন্ত জাতির বিরুদ্ধে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’। মার্চ মানে ২৪ বছর বাঙালির বঞ্চনা, শোষণ, বৈষম্যের হিসাব মেটানোর লড়াই। মার্চ মানে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন দেশের মালিক হওয়া। ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে’ মহামন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে নতুনভাবে নিজেদের আবিষ্কার করা। মার্চ মানে একটি জাতিগোষ্ঠীর স্বাধীনতা অর্জনের আকাক্সক্ষায় আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার জীবনপণ লড়াইয়ে নিজেদের সঁপে দেয়া।

সেই মহান স্বাধীনতার মাস মার্চে আমরা পা রেখেছি। সামনে ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা দিবস। এবার ৪৮তম। দখলদার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার লড়াই শুরু। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে যে ঘোষণায় মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিয়ে বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে তুলেছিলেন, ২৬ মার্চ পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধেরও আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়ে যায়।

সে কারণে ২৬ মার্চ বাঙালিদের কাছে স্বাধীনতা দিবসের স্বীকৃতি লাভ করে। যার সমাপ্তি ঘটে ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে, পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর ৯৩ হাজার পরাজিত সৈন্যের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে। তবে যে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ধাপে ধাপে তার চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে, এক পর্যায়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ২৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণাও মুক্তিযুদ্ধে মানুষকে নতুন করে উজ্জীবিত করেছে। যদিও তিনি ঘোষণাটি দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। তবুও তখনকার সেই পরিস্থিতিতে এ ঘোষণার তাৎপর্য ছিল বিশাল। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ নতুন গতি লাভ করে।

তবে মুক্তিযুদ্ধকে সামগ্রিক প্রেক্ষিতে উপলব্ধি করতে গেলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তানি নেতৃবর্গের অন্তরগত উদ্দেশ্য, ইসলামি ভ্রাতৃত্বের নামে দ্বিজাতি তত্ত্বের অসারতা, পূর্ব পাকিস্তানকে উপনিবেশ হিসেবে শাসনের ইতিহাস বুঝতে হবে। ব্রিটিশের হাত থেকে পাকিস্তান এবং ভারত স্বাধীনতা পেল ১৯৪৭ সালের ১৪ এবং ১৫ আগস্ট। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে কখনই তাদের সম-অংশীদার বলে মেনে নেয়নি। সম-সম্মান এবং অধিকারও স্বীকার করেনি পূর্ব পাকিস্তানিদের অধিকার হরণ করা এবং পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিমাদের শোষণের চারণভূমিতে পরিণত করাই ছিল প্রধান কাজ। মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ ছিল তাদের ধোঁকাবাজির হাতিয়ার। তারা আমাদের ভাষার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র করে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সবদিক থেকে আমাদের শোষণ-বঞ্চনায় পঙ্গু করে দেয়ার নিরন্তর চেষ্টা করতে থাকে।

পাশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর এই শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালিরা শুরু থেকেই প্রতিবাদমুখর থাকে। ’৫২-তে জীবনদান, ’৬৬-তে ৬ দফার আন্দোলনে জীবনদান, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে বাঙালির জীবনদান ইতিহাসে শোষক-নিপীড়কদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নিদর্শন হিসেবে রয়ে গেছে। তবে তার চূড়ান্ত পরিণতি আসে ১৯৭১-এর মার্চে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে। বাঙালিদের রুখবার সাধ্য আর কারও হয় না। চূড়ান্ত লক্ষ্য স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তারা থামে না। এর জন্য অবশ্য বিপুল মাসুল গুণতে হয় বাঙালিদের।

গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, বাঙালি জাতীয়তাবাদের আকাক্সক্ষা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে প্রায় ৩০ লাখ বাঙালিকে জীবন দিতে হয়। সম্ভ্রম হারাতে হয় প্রায় ২ লাখ মা-বোনকে। এ ছাড়া বাঙালির প্রায় প্রতিটি পরিবারই হয় ক্ষতিগ্রস্ত। যার ক্ষত আজও অনেককে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। আজ বাংলাদেশের যে চিত্রটি মানুষ দেখতে পায়, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। বাংলাদেশে যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে, স্বাধীনতার স্বরূপ তাদের এক একজনের কাছে একেক রকম দাঁড়ায়। যার সঙ্গে সাধারণ মানুষ, যারা জীবন দিয়েছেন, সম্ভ্রম দিয়েছেন- তাদের স্বপ্নের, আকাঙ্খার কোন মিল নেই। ক্ষমতাসীনরা সাধারণ মানুষকে যা বুঝাতে চায়, তার সঙ্গে বাস্তবতার কোন মিল তারা খুঁজে পায় না।

স্বাধীনতার ঘোষিত যে স্তম্ভ, তার প্রায় সব কটিই ভেঙে দেয়া হয়েছে। গণতন্ত্রকে বাংলাদেশের মানুষ অনুভব করতে পারে না। ধর্ম নিরপেক্ষতাও নেই। আজ সাম্প্রদায়িক সহিষ্ণুতা অনুপস্থিত বলে মনে হয়, যখন দেশে প্রায়ই সখ্যালঘুদের তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা হতে দেখা যায়। অনেকে ধর্ষণের শিকার হয়। আর সমাজতন্ত্রকে তো আনুষ্ঠানিকভাবেই জানানো হয়েছে গুডবাই। বাংলাদেশে এখন আর সামাজিক ন্যায়বিচার, সুশাসনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। সব কিছু দেখা হয় দলীয়করণের মোড়কে। জনগণের ধারণাকে সামান্যতম গুরুত্ব দেয়া হয় না। জনগণ যাই ভাবুক, কিছুই যায় আসে না। ক্ষমতাসীনরা যা বলবে, তাই সত্য!

বাংলাদেশে আজ শিক্ষা ব্যবস্থাকে সম্পূূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়ার পরিকল্পনা লক্ষ করা যাচ্ছে। সব ক্লাসের, সব ধরনের প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন গুরুতর কোন বিষয় বলেই গণ্য হয় না। এখন কেউ আর ক্লাসে যায় না, কোচিংয়ে যায়। একজন শিক্ষার্থী হেডমাস্টার বা অধ্যক্ষের নাম জানে না। অন্য ক্লাসের কোন শিক্ষকের নামও জানে না। শুধু কোচিং টিচারের নাম জানে! আগে সবাই স্কুল বা কলেজের সব শিক্ষকের নাম জানতো। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন, শুধু ক্ষমতাসীনরাই নিরুদ্বেগ। তাদের কথা- সব ঠিক!

উন্নয়নের দৃশ্যমান অনেক কিছু দেখা যায়। তা নিয়ে ক্ষমতাসীনদের অহঙ্কার এবং জনগণের ভাল লাগা থাকলেও আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনায় সচেতন মানুষ দারুণভাবে উদ্বিগ্ন। সরকারের রাজনৈতিক বিবেচনায় পাওয়া ব্যাংকগুলো এবং সরকারি অনেক ব্যাংক প্রায় দেউলিয়া। জনগণের টাকায় রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা যা খুশি তাই করছে। কোন স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতাও দেখা যায় না। অথচ দেশটি স্বাধীন হয়েছিল এই আকাক্সক্ষা নিয়ে যে, দেশের সাধারণ মানুষ হবে দেশের মালিক। যে আকাক্সক্ষায় ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছিল। ২ লাখ মা-বোন হারালো সম্ভ্রম।

স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে মানুষের মনে তাই আজ অনেক প্রশ্ন। কোন মহলই মানুষের মনের সেই সব প্রশ্নের জবাব দিতে ইচ্ছুক নয়। আমরা গর্ব করি অনেক উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিয়ে। কিন্তু ৪৭ বছরের সব প্রশ্নের মিমাংসাও হওয়া দরকার। সবচেয়ে বড় কথা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরও অনেক কাজ, অনেক গবেষণা করা জরুরি।

আমরা ২০১৮-এর স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে প্রত্যাশা করি- মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে মানুষকে শাসন করার দিনের অবসান ঘটুক। প্রকৃত অর্থে মানুষের মস্তিষ্কে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ক্রিয়া করুক। প্রত্যাশা করি, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দাপট থেকে জাতি মুক্তি পাক। আজ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধায় ছেয়ে গেছে সর্বত্র। মুক্তিযোদ্ধার দাবি নিয়ে মারামারিও হচ্ছে। কেউ হাসপাতালে যাচ্ছে, কেউ জেলে। এ রকম অবস্থার অবসান ঘটুক।

এবারের ৪৮তম স্বাধীনতা দিবস মুক্তিযুদ্ধের মহিমায় উদ্ভাসিত হোক। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ সুগম হোক। স্বাধীনতা দিবসে সব মুক্তিযোদ্ধাসহ দেশপ্রেমিক সব মানুষের প্রতি ঠিকানার পক্ষ থেকে রইল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।