৯/১১ একটি রক্তক্ষরণের দিন

আবদুস শহীদ :

এই শতাব্দীর সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা নাইন ইলেভেনের ২১ বছর পূর্তি হয়েছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলায় টুইন টাওয়ার ধ্বংস হয়।

১৯৮৯ সালে আমেরিকায় পা রাখার পরপরই মাথায় ছিল পৃথিবীখ্যাত নিউইয়র্কের বিখ্যাত স্থাপনা এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং ও ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার দেখার। ১১০ তলাবিশিষ্ট আকাশচুম্বী এই টুইন টাওয়ার। শুনেছি, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ১০৭ তলায় উইন্ডস অব দ্য ওয়ার্ল্ড নামে একটা রেস্টুরেন্ট আছে, ওখানে নাকি বেশ কজন চাঁদকপালি বাংলাদেশি ওয়েটারের কাজ করেন। শুনেই যেন মনে হলো, দেখা পেলে তাদের কপালের সঙ্গে কপাল ঠুকে দোয়া চাইতাম। কিন্তু এত বড় নিউইয়র্ক সিটির কে কোথায় থাকে তার কি হদিস আছে? শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন পোষণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকল না কিন্তু টুইন টাওয়ার দেখার ইচ্ছা মনেই রয়ে গেল। পরিচিত যাকেই দেখি, বলি, চলেন ভাই, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার দেখতে যাব। সবাই বলে, কাজ আছে। কারও ছুটির দিনে আমারও কাজ থাকে। এভাবে চলে যাচ্ছিল। ১৯৯৩ সালে এক স্বজন এলেন লন্ডন থেকে। আলাপে বোঝা গেল, লন্ডনের পাট চুকিয়ে সুবিধা পেলে আমেরিকায় সেটেল্ড হাওয়ার ধান্দা।

একদিন আমাকে জানালেন, আমেরিকার বিখ্যাত স্থাপনাগুলো দেখার খুবই শখ। আমি মনে মনে খুবই উৎফুল্ল হলাম, যাক এত দিন পর চমৎকার স্থানগুলো দেখার একজন সঙ্গী পাওয়া গেল।

একদিন সুযোগমতো সকালে দুজন বেরিয়ে পড়ি। আগেই জেনে নিলাম, পাতাল ট্রেনের ঊ বর্ণমালার ট্রেনটি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার পর্যন্ত যায়। ট্রেন থেকে নেমেই কিছুদূর এগিয়ে চলে গেলাম গন্তব্যে। এলিভেটরে ঢুকেই মনে হলো এত উঁচুতে উঠতে না জানি কতক্ষণ লেগে যাবে, কিন্তু না, মনে হলো মুহূর্তেই এলিভেটর নামের একটি ঘর দণ্ডায়মান সব দর্শনার্থী নিয়ে উঠে গেল ১০৮ তলায়। এর উপরে ওঠার নাকি নিয়ম নেই। ওই দিন ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল কিন্তু ১০৮ তলা থেকে নিচে তাকিয়ে দেখি, আকাশ আর জমিন একেবারে ঝাঁপসা ধোঁয়াশা। নিচে তাকিয়ে দেখি, মাঝেমধ্যে পিপীলিকার সারির মতো গাড়িগুলোর লাইন দেখা যায়।

দূর থেকে আসা বিমান দেখে মনে হয়, এই বুঝি বিল্ডিংয়ের সঙ্গে বেজে গেল। সারাক্ষণ মনের মধ্যে একটা ভয় যেন কাজ করছে আর ভাবছি নির্ধারিত সময়টা এত লম্বা কেন। নিচে নেমে যেতে পারলেই যেন বাঁচি। এভাবেই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার দেখা। এই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার বা টুইন টাওয়ার মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে যাবে, তা ছিল কল্পনারও অতীত।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঘুম ভাঙল সকাল সাতটায়। আগে থেকেই তারিখ ও সময় নির্ধারিত ছিল আমার ছোট মেয়ের ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, তাও আবার ম্যানহাটনে। সকাল সাড়ে নয়টায় সময় নির্ধারিত থাকলেও আধা ঘণ্টা আগেই পৌঁছাতে হবে।
তাই পুরোনো অভ্যাস অনুযায়ী টিভি দেখতে দেখতে নাশতা করছিলাম। ইতিমধ্যে মেয়ে হয়তো বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ কী! টিভির স্ক্রিনে নজর দিতেই অবিশ্বাস্য কিছু একটা ভেসে উঠল। নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না আমি টিভি দেখছি, না হলিউডের কোনো মুভি দেখছি। একটা ঘোরের মধ্যে কতক্ষণ ছিলাম, তা বলা যাবে না। মেয়ের ডাকে আমার ভ্রম ভাঙল। বলল, আজ আর ডাক্তারের কাছে যাওয়া হবে না। কারণ, তার এক বান্ধবী নাকি জানিয়েছে, ম্যানহাটনের কোথাও আগুন লেগেছে। তাই পাতাল রেলসহ সব যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তখন মেয়েকে টিভির দিকে ইশারা করে বললাম, একটি বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়ে টুইন টাওয়ারে আঘাত করেছে।

কথা বলতে না বলতেই দ্বিতীয় বিমানটি একইভাবে টুইন টাওয়ারের দ্বিতীয় টাওয়ারে আঘাত করে এবং সঙ্গে সঙ্গে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে।

তখন আর বুঝতে দেরি হলো না যে এটা সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, এটা কোনো সন্ত্রাসী হামলা। তৎক্ষণাৎ বাইরে বের হয়ে দেখি, ম্যানহাটনের ডাউনটাউনের পুরো আকাশ ধোঁয়ায় ধূসরিত। পথচারী তেমন কাউকেই পেলাম না পুরো ঘটনা জানার। ফোনে দু-একজনকে পাওয়া গেল, কিন্তু কেউই কোনো সঠিক জবাব দিতে পারল না। তখন আনমনেই টিভি পর্দায় চোখ রাখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। কখনো ফক্স নিউজ, কখনো সিএনএনে রিমোট চালাচ্ছি। পরিশেষে যা বোঝা গেল, এটা ছিল এক বীভৎস সন্ত্রাসী হামলা।

এভাবেই ঘটেছিল নাইন ইলেভেনের ঘটনা। সেদিন সন্ত্রাসীরা চারটি বিমান ছিনতাই করে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। দুটি বিমান দিয়ে আঘাত করা হয় নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র টুইন টাওয়ারে, একটি ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে, আরেকটি পেনসিলভানিয়ার খোলা মাঠে বিধ্বস্ত হয়। আমেরিকায় সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলায় চার বিমানের সব যাত্রীসহ তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন। আগুনের লেলিহান শিখা থেকে রক্ষা পেতে অনেকে বিল্ডিংয়ের জানালা দিয়ে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্যর্থ চেষ্টায় আত্মাহুতি দিল। আমি ও আমার মতো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ চেয়ে চেয়ে দেখল এ বীভৎস দৃশ্য।

এই বিধ্বংসী হামলায় পুরো বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে যায়। ঘটনাটি ছিল কল্পনারও অতীত এবং কী করে যে সবার অজান্তে এমন একটি ঘটনা ঘটে গেল, কেউ তা জানতেই পারল না। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।

অনেক আগে থেকেই নাকি প্রশাসনের কেউ কেউ আঁচ করতে পেরেছিলেন এমন একটি সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে। সিআইএ, এফবিআই, এমনকি মার্কিন কংগ্রেস কমিশন সবাই এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিল। ২০০১ সালের গ্রীষ্মকালজুড়েই এসব সতর্কবাণী চারদিক থেকেই ভেসে আসছিল।

এ নিয়ে দেশের বিখ্যাত চিন্তাবিদেরা একটি কমিশন রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন যে আগামীতে আমেরিকার ওপর কী রকম নিরাপত্তাঝুঁকি আসতে পারে। তার জন্য প্রায় আড়াই বছর সময় লেগেছিল রিপোর্টটি তৈরি করতে। এ জন্য কমিশন ২০টি দেশের শতাধিক লোকের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছিল এবং এটাই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার নিরাপত্তার ওপর সবচেয়ে বিশদ পর্যালোচনা। কমিশনের ১১ জন সদস্য সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে উপলব্ধি করেন যে আমেরিকানরা একটা স্পষ্ট এবং বিদ্যমান ঝুঁকির সম্মুখীন। তবু তারা মনে করেন, দেশের মাটিতেই মরবেন, তা যত বড় সংখ্যায়ই মৃত্যু আসুক।

এই কমিশন গঠন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ২০০১ সালে যখন কমিশনের রিপোর্টটি বের হয়, তখন হোয়াইট হাউসে নতুন প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান জর্জ ডব্লিউ বুশ মাত্র ১১ দিন আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রিপোর্টটি প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দেওয়া হয়। কমিশনের ধারণা, রিপোর্ট হাতে পেয়েও প্রেসিডেন্ট এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেননি। বুশ প্রশাসন পরে বলেছিল, কোনো সতর্কবাণীর ভিত্তিতে কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া যুক্তিযুক্ত হতো না, কারণ এতে নির্দিষ্ট কোনো কিছু ছিল না। পরে জানা যায়, অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের ফিনিক্সের এক এফবিআই অফিসার ২০০১ সালের জুলাই মাসে একটি রিপোর্ট পাঠালেন, যা এখন বিখ্যাত দলিল হিসেবে গণ্য হচ্ছে। তিনি কিছু ঘটনার বর্ণনা দিয়ে দাবি তোলেন, এর তদন্ত করা হোক। কিন্তু এফবিআইয়ের কর্তাব্যক্তিরা এ আবেদনের কার্যক্রম থামিয়ে দিলেন। তাদের ধারণাই ছিল না যে এভাবে বিমান উড়িয়ে টুইন টাওয়ারে আঘাত হানতে পারে। তারা বিষয়টি ফুঁ মেরে উড়িয়ে দিলেন।

সিআইএর কাছে কিন্তু সতর্কবার্তা ঠিকই বেজেছিল। তখন সিআইএর প্রধান ছিলেন জর্জ টেনেট। ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার ১৪ বছর পর সিবিএস টিভির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সেই গ্রীষ্মকালে তাদের কাছে এমন সব খবর আসতে থাকে যে তাতে বোঝা যায় আল কায়েদা যেকোনো সময় আমেরিকার ওপর হামলা করতে পারে। কিন্তু বুশ প্রশাসনকে কিছুতেই বোঝানো সম্ভব হয়নি। তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইসের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। কন্ডোলিজা রাইস রাজি হলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মি. চেনির সঙ্গে আলাপ করতে।

এর পাঁচ দিন পরই আক্রমণ হলো। টুইন টাওয়ারে কর্মরত অবস্থায় তিন হাজার লোক প্রাণ হারাল। এর মধ্যে ডজনখানেক বাংলাদেশি প্রাণ হারান। দমকল বাহিনীর ৩৪৩ জন কর্মী এবং হামলার দিন টুইন টাওয়ারে কর্মরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৭১ জন কর্মী প্রাণ হারান।

পরবর্তী সময়ে এই হামলার দায় মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর বর্তায়। মুসলমানরা চরম ক্ষোভের মুখে পড়েন। দাড়ি-টুপিওয়ালা লোকদের ধর্ম-বৈষম্যের শিকার হতে হয়। মুসলিমবিরোধী ঘৃণা ও প্রতিহিংসা এমন প্রকট হয়েছিল যে লম্বা দাড়ি ও পাগড়িওয়ালা অনেক শিখ ধর্মাবলম্বীকেও হেইট ক্রাইমের শিকার হয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে। ২০০১ সালের পর হেইট ক্রাইম হামলার ঘটনা পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারে হামলা চলে নির্বিচারে। মুসলমানরা রাস্তাঘাটে প্রকাশ্যে এমনকি গুপ্তহত্যার শিকার হন।
১১ সেপ্টেম্বরের পর আমেরিকা তথা সারা বিশ্বের রাজনৈতিক কার্যক্রম ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়। জঙ্গিবাদ নির্মূলে নেমে পড়ে আমেরিকা। ইরাক, আফগানিস্তান দখলের পর এখন পূর্ব-পশ্চিমে জঙ্গি দমন নীতি অব্যাহত আছে এই ৯/১১-এর কারণে। এ ঘটনায় বিন লাদেন অভিযুক্ত হলে তাকে হত্যা করে তার লাশ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার অনুসারীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিশ্বের সর্বত্র। জঙ্গিবাদের সঙ্গে ধর্মীয় নাম যুক্ত হওয়ায় পশ্চিমা বিশ্বে মুসলমানরা হচ্ছেন লাঞ্ছিত।

এরপরও ৯/১১ বাংলাদেশি আমেরিকানদের জন্য ছিল দুর্ভাগ্যজনক ও হৃদয়বিদারক দিন। এর শিকার হন বাংলাদেশি শাকিলা, তার স্বামী নুরুল হক মিয়াসহ নাম না-জানা বেশ কিছু বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট ওয়েটার থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার কর্মজীবীরা।
দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল ‘এক বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র’ ২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর উদ্বোধন করা হয়। আজও আকাশছোঁয়া এই ভবনের দিকে তাকালে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। মনে হয়, এখানেও মিশে আছে আমাদের বাংলাদেশি ভাইবোনের রক্ত। তাই এ দেশের সুখে-দুঃখে, হাসি-কান্নায় আমাদেরও একাত্মতা প্রকাশ করা উচিত। ৯/১১ দিনটি এলেই আমরা বাংলাদেশি আমেরিকানরা স্তব্ধ হয়ে যাই। আমরাও বুকের মধ্যে রক্তক্ষরণ নিয়ে এই দিনটাকে স্মরণ করি।