মা

মাহমুদ রেজা চৌধুরী: একজন মা তার সন্তানকে কতটা ভালোবাসেন, সেটা মা কখনো সে রকমভাবে হিসাব করেন না বা ভাবেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখতে পারি, বিষয়টা সন্তানেরাও সেভাবে চিন্তা করে দেখেন না; যতক্ষণ পর্যন্ত মা কাছে থাকেন বা পাশে থাকেন। যে মুহূর্তে মা চলে যান, মনে হয় মা তো ছিলেন, আর ফিরে আসবেন না। মাকে আর দেখব না। চোখের কোণে অজান্তেই জল আসে। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ বলেন, ‘আমার পরে যদি আমি কাউকে সেজদা করার নির্দেশ দিতাম, সে ক্ষেত্রে তিনি হতেন তোমার মা।’ ইসলাম ধর্মে বলা হয়, সন্তানের ইহকাল ও পরকাল; তার শান্তি নির্ভর করে অনেক ক্ষেত্রেই তার মায়ের দোয়ায়। হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।’ (সূত্রটি ইমাম কদ্বায়ী তার ‘মুসনাদে শিহাব’ গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ১০২ পৃ. হাদিস : ১১৯, মুসলিম আনসারি, আল-কুনি ওয়াল আসমা, ৩/১০৯১ পৃ. হাদিস : ১৯১২)। এই দর্শনে মাকে কতটা উচ্চ মর্যাদায় ইসলাম বিবেচনা করে, সেটাই উল্লেখ করা হয়েছে। আমাদের নবী ও আল্লাহর মেসেঞ্জার মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে একদিন এক ব্যক্তি এসে বলল, ‘হে মুহাম্মদ (সা.), জীবনে আমি অনেক অন্যায় করেছি, পাপ করেছি। আপনি দয়া করে আল্লাহর কাছে আমার জন্য দোয়া চান, যাতে আল্লাহ আমাকে মাফ করে দেন।’ মুহাম্মদ (সা.) আগন্তুকের কথা শুনে বললেন, ‘তুমি তোমার মায়ের কাছে যাও। তার কাছে ক্ষমা চাও। তোমার মা আল্লাহর কাছে তোমার জন্য দোয়া করলে আল্লাহ তায়ালা তোমাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।’ কথা শুনে আগন্তুক বলল, ‘হে মুহাম্মদ, আমার মা নেই।’ মুহাম্মদ (সা.) তখন বললেন, ‘তাহলে তুমি তোমার মায়ের কোনো বোনের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাও।’ আগন্তুক আবার বলল, তার মায়ের কোনো বোন নেই। নবী বললেন, ‘তাহলে তুমি তোমার মায়ের পরিচিত কোনো বন্ধু কিংবা তোমার মাকে চেনেন বা চিনতেন, তার কাছে যাও। সেও যদি তোমার জন্য দোয়া করে, আল্লাহ সে দোয়া শুনতে পারেন।’ এই কথায় ইসলাম ধর্মে মায়ের মর্যাদা কতটা সুউচ্চে, তা বোঝা যায়।
পৃথিবীতে মায়ের বিকল্প নেই। মা আমাদের ১০ মাস গর্ভে ধারণ করেন অনেক কষ্ট এবং মমতা নিয়ে। শিশু জন্মের পরে মায়ের বুকের দুধ খেয়ে প্রথম জীবনের শক্তি বা পুষ্টি অর্জন করে। এই ঋণ কিছুতেই কি মেটানো সম্ভব হতে পারে? পারে না। সন্তান বৃদ্ধ হয়ে গেলেও মা-ই একমাত্র তাকে বুকে টেনে নিয়ে চুমু খান, আদর করেন গভীর মমতা দিয়ে। মায়ের এই মমতা ও স্নেহের কি তুলনা হয়? এটা সম্ভব কেবল একজন মায়ের পক্ষে। আর কেউ এটা করবে না বা করতে পারেও না। মা নিজে না খেলেও সন্তানের খাওয়া, সন্তানের বিশ্রাম, সন্তানের সুস্থতা এসবকে নিশ্চিত রাখতে চেষ্টা করেন তার জীবনের প্রতিটি ঘাম ও রক্তবিন্দু দিয়ে। মা ছাড়া এই কাজটা কে করে বা করবে? ভাবার বিষয় আছে। বাবা কখনো কখনো সন্তানকে ছেড়ে চলে গেলেও মা ছেড়ে যান না। ব্যতিক্রম কোথাও এর হতে পারে। সেটা আলোচনার বিষয় নয়। মানবতাবোধ, মানবিকতা, সহানুভ‚তিশীলতা, স্নেহ ও মায়া-এই প্রাথমিক শিক্ষাগুলো মানব সন্তান প্রথম শেখে মায়ের কাছ থেকে। অধিকাংশ সময় লক্ষ করি, সন্তান মায়ের এই অনন্য অবদানকে হয় ভুলে যায় অথবা হালকা করে দেখে বা দেখি।
পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে এই মায়েদের বিভিন্ন রূপ ও চরিত্র দেখতে পারি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বলতে পাক-ভারত উপমহাদেশের মায়ের বৈশিষ্ট্যে আমরা যে যত্ন, আবেগ ও মায়া দেখি; তার সাথে পশ্চিমা সমাজ ও সংস্কৃতির একটা ব্যবধান আছে। আমাদের মায়েরা তার সন্তানকে যেকোনো দুর্যোগে কিংবা সংকটে, সুখে-দুঃখে আঁকড়ে ধরে থাকেন এবং সন্তানের যেকোনো বিপদ মুক্তির জন্য রাত জেগে প্রার্থনা করেন সৃষ্টিকর্তার কাছে। এ রকম দৃশ্য উন্নত অনেক সমাজ অথবা রাষ্ট্রে দেখা যায় কম। আমাদের মা নিজেরা দুর্বল এবং অসুস্থ থাকলেও রাত জেগে অসুস্থ সন্তানের শিয়রের পাশে বসে থাকেন একটু জ্বর-কাশি হলেও। অস্থির হয়ে যান সন্তানের সুস্থতার আকুল প্রার্থনায়। সেই মা যদি ঘরের বাইরেও কাজ করেন, তাহলেও এই উদ্বেগ, আবেগ ও ভালোবাসার এতটুকু কমতি হয় না আমাদের মায়েদের।
পাশাপাশি যদি কথিত উন্নত বিশ্ব সমাজের অধিকাংশ মায়েদের দেখি বা লক্ষ করি, সেই মা সন্তানকে তার শয্যাপাশেও রাখেন না। সন্তান থাকে পাশের রুমে। বড় হয় বেবিসিটারের পরিচর্যায়। সেখান থেকেই শুরু হয় মা ও সন্তানের ভেতরকার মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের। অনেকটা এ কারণেও পশ্চিমা সভ্যতায় ‘মাদারস ডে’ বলে একটা দিন পালিত হয়। এই দিনে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে রিজার্ভেশন থাকে অনেক। চকলেট ও ফুল এসবের ব্যবসা হয় প্রচুর। পুঁজিবাদী অর্থনীতির সংস্কৃতিতে এই দিনটাকে এ কারণেই প্রতিবছর হইচই করে পালন করা হয়। এই দিনের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়, মায়ের সব ঋণ সন্তান যেন শোধ করে দিল। এমন একটা ভাব বা ইমেজ তৈরি করা হয়।
সম্প্রতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এবং আমাদের বাংলাদেশেও ‘মাদারস ডে’র বাণিজ্যিক উদ্যাপন বাড়ছে। লক্ষ করা যায়, এ নিয়ে যে হইচই বাংলাদেশে এখন হচ্ছে, সেটা যেন এ রকম, ‘মাদারস ডে’ না হলে হয়তো মায়ের আর অস্তিত্বই থাকে না। কিন্তু যে মা বা বাবা তারা তো সন্তানের প্রতিদিনের মা ও বাবা। তাদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব এবং কর্তব্য বছরের একটি দিন ঘটা করে পালন করার মধ্যে কতটুকু-বা গুরুত্ব থাকতে পারে! সময় ও সভ্যতা বদলেছে, সাথে সাথে সবই যেন কৃত্রিম পণ্য হয়ে গেছে। মায়ের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসাও তা-ই।
দেশকে ভালোবেসে মা বলে ডাকি। আরেকটি বিষয় আছে, আমরা আমাদের জন্মভ‚মিকে মাতৃভূমি বলি কিন্তু পিতৃভূমি বলি না। ভাবার ব্যাপার আছে। এখানেও মায়ের কী মর্যাদা, ভালোবাসা সেটা আমরা বুঝি? পশ্চিমা সংস্কৃতিতে মাদারল্যান্ড বলে কম; যতটা বলে হোমল্যান্ড। আমাদের সাহিত্য, গল্প, নাটক, উপন্যাস, কবিতা, সংগীত-এই সবে মাকে নিয়ে আছে অনেক গল্প এবং আকুলতার কথা। মাকে নিয়ে পৃথিবীতে বিখ্যাত অনেক উপন্যাস আছে। যেমন বিখ্যাত রুশ লেখক ঊশযধহ ঘবুধ ওরফে ম্যাক্সিম গোর্কির সুপরিচিত উপন্যাস (গঅঞই) অর্থাৎ মা এই বইটি। পাশাপাশি উল্লেখ না করলেই নয়, আমাদের এই সময়ের জনপ্রিয় গল্পকার ও ঔপন্যাসিক আনিসুল হকের ‘মা’ উপন্যাসটির কথা। এই উপন্যাসে গল্পকার আনিসুল হক আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একজন মা তার সন্তানকে কীভাবে সাহস জুগিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন সন্তানকে ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার এরই একটি সুন্দর বর্ণনা আছে বইটিতে। বইটি জনপ্রিয় হওয়ার একটি বিশেষ কারণ, এই বইয়ে যে মায়ের কথা বলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ একটি বাস্তব ও সত্য ঘটনার আলোকে। সন্তানকে মা শিখিয়েছেন মাতৃভূমির স্বাধীনতাসংগ্রামে কীভাবে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এ রকম হাজার হাজার নাম না-জানা মায়েদের ত্যাগ ও সাহস জোগানোর অনেক গল্প ও ইতিহাস আছে। আমরা জানি তার সামান্য। একজন মা-ই পারেন সন্তানকে ন্যায় ও সৎপথে থাকার আদর্শিক পথের আলো দেখাতে। যেমন করে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে একজন ভালো মা দাও, আমি তোমাদের একটি উন্নত রাষ্ট্র বা সমাজ দেব।’ মায়ের কী বিশাল অবদান ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষিতে সেটা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে লেখা বা বলা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই অল্প কথায় কিছু কথা বলার এই চেষ্টা মাত্র। এটা দুঃখজনক যে বর্তমান এই দুর্যোগকাল বলতে কোভিড এপিডেমিকের সময় আমরা পড়েছি যে এই কঠিন সময়ে অনেকের মা মারা গেলে তাদের সন্তান মাকে সঠিকভাবে দাফন করাতেও দূরে সরে ছিলেন। ভাবতে কষ্ট হয়! কী করে সম্ভব এ রকম কিছু করা। আসলে সময়টা এখন অনেক অসম্ভবের সম্ভাবনাকেও সহজ করে দিচ্ছে। মা তার সন্তানকে, বিশেষ করে আমাদের অঞ্চলের মা তার সন্তানের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করেন, যে কষ্ট করেন, সন্তানকে যেভাবে যেকোনো বিপদ-আপদ থেকে দূরে রাখতে এবং নিরাপদে রাখতে চেষ্টা করেন; এর কোনো তুলনা নেই। আমরা অনেকে বলি একজন বাবার জন্য সবচেয়ে বড় বোঝা তার সন্তানের লাশ তার কাঁধে বহন করা। হতেও পারে। পাশাপাশি আমরা যেন মনে রাখি, একজন সন্তানের জন্য তার মাকে কাছে পাওয়া সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার। সংসার থেকে কখনো কোনো কারণে বাবা দূরে সরে গেলেও বা দূরে থাকলেও মা থাকেন সর্বক্ষণ সন্তানকে তার আঁচলের ছায়ায় রেখে।
বর্তমান প্রজন্মের মায়েরা ঘরে ও বাইরে উভয় ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যস্ত সামাজিক ও আর্থিক পরিবর্তনের কারণে। সেক্ষেত্রেও এই প্রজন্মের মায়েরাও সন্তানের প্রতি তাদের যত্ন ও পরিচর্যায় এতটুকু দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেন না। বরং দেখা যায়, এই মা’ও তার সারা দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে ঘরে ফিরে ক্লান্ত ও শ্রান্ত দেহে সবার আগে সন্তানের খোঁজ নেন। সারা দিন সন্তানের দিনটা কেমন গেল, কী খেল, কী খেল না, সবকিছুর খোঁজ নেন। এরপর রাতে শোবার আগে সন্তানের পরের দিনের সবকিছুর সুব্যবস্থা করে ঘুমোতে যান। মা বলেই এটা তার জন্য সম্ভব। বাবাদের ছুটি থাকে সপ্তাহে এক দিন বা দুই দিন। কাজ শেষে বাড়ি ফিরে টিভির সামনে বসে রিলাক্স করেন হাতে চায়ের কাপ নিয়ে। কিন্তু মায়েদের সাপ্তাহিক কোনো ছুটি নেই, কেবল ছোটাছুটি আছে। তারা কাজ থেকে ফিরে হাতে চায়ের কাপ নিয়ে মাআরামকেদারায় বসতে পারেন না। এটা আমাদের অঞ্চলের মায়েদের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য। যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বিরল। অনেক সন্তানেরা মায়েদের এই ভালোবাসাকে, যত্নকে এবং সেবাকে ধরে নেই এটা আমার অধিকার ও প্রাপ্য। তাই এটার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতাবোধ, ভালোবাসা এবং সহানুভূতির দৃষ্টি অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত থাকে। এ কারণে আমরা আমাদের অনেকের বৃদ্ধ মাকে কখনো কখনো বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাই, যা দুঃখজনক। ধর্মেও বলা আছে, আমাদের কোনো আচার-আচরণে মা যেন উঁহ্ শব্দটিও উচ্চারণ না করেন। একটা কথা সত্য, যেকোনো সংকট বা বিপদ অথবা চ্যালেঞ্জে প্রমাণিত হয় ভালোবাসার রূপ এবং রূপান্তরের স্তরবিন্যাস কী রকম। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে প্রমাণ করেছি দেশমাতৃকার প্রতি আমাদের কঠিন প্রত্যয় এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অসংখ্য দৃষ্টান্তকে। আমাদের স্বাভাবিক জীবনে আমাদের জন্মদাত্রী মা, তাকেও যেন আমরা যত্ন নিতে পারি। একই আন্তরিকতা ও প্রতিশ্রুতি নিই যেকোনো দুর্যোগে, দুঃসময়ে ও সংকটে।
পৃথিবীতে অনেকেরই মা নেই। যাদের মা আছেন তাদের পক্ষে বোঝা কষ্ট হবে মায়ের শূন্যতা কাকে বলে বা কেমন হয় সেটা। তাই যাদের মা কাছে আছেন, বেঁচে আছেন, সুস্থ আছেন-এটা সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার মাকে পাওয়া। আমার নিজেরও মা নেই, তাই কখনো কখনো মনটা কাঁদে এবং মাকে বড় বেশি মনে পড়ে। পৃথিবীতে অনেক সম্পদের পূরণ হতে পারে। কিন্তু মা যে সম্পদ, তা একবার হারালে সেই শূন্যস্থান আর কিছুতেই পূর্ণ হবে না এই জীবনে। মা যাদের বেঁচে নেই, তাদের মাঝে মাঝে হয়তো পল্লিকবি জসীমউদ্্দীনের কবিতা ‘মুসাফির’-এর দুটি লাইনের কথা মনে পড়ে।
‘নয়ন ভরিয়া আছে আঁখি জল, কেহ নাই মুছিবার,
হৃদয় ভরিয়া কথার কাকলি, কেহ নাই শুনিবার।’
পুনশ্চ : এই রচনায় উল্লিখিত মাকে সেজদা করার কথাটা জনশ্রুত।

লেখক : সমাজ ও রাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক
Email: [email protected]
জুলাই ১৬, ২০২০